জিয়ার খেতাব বাতিলে বিএনপির পালে হাওয়া

772
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

মো. শফিকুল ইসলাম : স্বাধীনতার ৫০ বছর বছরে এসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আবার নতুন করে টানাটানি শুরু হয়েছে। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জিয়ার নাম মুছে ফেলার নতুন ষড়যন্ত্রের কারণে বিএনপি আগের তুলনায় আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভুলে সবাই এক কাতারে দাড়াচ্ছে। পুলিশের হামলা মামলার কথা ভুলে রাজপথে নতুন উদ্দ্যোম নিয়ে আবারো মাঠে নামবে দলের নেতাকর্মীরা। খেতাব বাতিলের প্রশ্নে ঝিমিয়ে পড়া তৃণমূলও চাঙ্গা হবে। এমনকি বিএনপিকে আন্দোলনের জন্যও উস্কে দিচ্ছে সরকার। আলজাজিরা রির্পোট ও জিয়ার খেতাব বাতিল হলে জনগণ আরো ফুসে উঠবে। তাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় জোয়ার আসতে পারে যা বিএনপির পালে নতুন করে হাওয়া লাগছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি সময়ে বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের মধ্যে দলীয় কোন্দল ছিল প্রকৃট। কিন্তু তাদের নেতা জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের কথা শুনার পর সবাই মাঠের রাজনীতিতে একত্রিত হচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতারা মধ্যে দুরত্বও কমে আসছে। দলের মধ্যে নিক্রিয় নেতারা আবার সক্রিয় হচ্ছে। জিয়ার অবদান বাতিলে সিধান্তে সাধারণ মানুষও আওয়ামী লীগের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ভুলে যাওয়া বিএনপির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। জিয়ার খেতাব যদি বাতিল করা হয় তাহলে দেশের প্রধান বড় দুই দলের রাজনীতির শেষ পেরেক মারা হয়ে যাবে। মামলা হামলায় জর্জরিত বিএনপির জন্মের ইতিহাসে হাত দিয়ে ভুল করছে সরকার বলে মনে করছেন তারা।

এবিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দিন পরির্বতনকে বলেন, দেশের জনগণ যখন জাতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে চাইছে ঠিক তখনই সরকার নতুন নতুন ইস্যু সৃষ্টি করছে। এটা সরকারের একটা নতুন চাল। কারণ জনগনের দৃষ্টি যাতে অন্য দিকে থাকে। আশা করি বর্তমান সরকার জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবে। মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে টানাটানি না করে বরং সংবিধান, গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে দিবে।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক অসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, জিয়ার খেতাব বাতিল যখন তৃতীয় জায়গা থেকে দেখি, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে কারা হত্যা করল। হত্যাকারীরা সবাই চিহ্নিত। সবোচ্চ আদালতে ফাঁসি রায় হয়েছে। তাদের সহযোগিতা করেছে কারা তা পরবর্তীতে বিভিন্ন কাজের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল বঙ্গবন্ধু ছিল আর্দশ। ৭২ সংবিধান ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা থাকাকালে আত্মসীকৃত খুনিদের দুতাবাসে চাকরি দিয়েছেন। বাংলাদেশকে আলাদা রাস্ট্রে পরিণত করেছিলেন। খুনিদের কাছে তার দায়বদ্ধতা ছিল। কিভাবে দেশ চলবে তার চিত্র আগেই আঁকা হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নিয়ে পালামেন্ট করতে পারতেন কিন্তু তা না করে সামরিক শাসন জারি করলেন। সামরিক শাসনের মাধ্যমে সে রাষ্ট্রকে হত্যা করেছে তাহলে রাষ্ট্র যে উপাধি দিয়েছে তা কেন ফেরত নিতে পারবে না?

তিনি আরো বলেন, বিএনপির রাজনীতির ধারা এখনো একই রয়েছে। কোন পরিবর্তন নেই। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ করেছে এটা কখনো অস্বীকার করা যাবে না। খেতাব বাতিলে কারণে বিএনপি নেতাকর্মীরা নতুনভাবে উজ্জীবিত হবে স্বাভাবিক। বাতিল করার জন্য সরকার বিভিন্নভাবে তাদের পদক্ষেপ নিবে। সংঘাত, সংঘর্ষ আর ক্ষমতার দাপট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সব রাজনৈতিক দলগুলোকে মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানের জায়গায় আসতে হবে। দেশকে ভালবাসতে হবে জনগণকে ভালবাসতে হবে।জানা গেছে, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের দেশত্যাগের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন দূতাবাসে তাদের পদায়ন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের যারা প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেছে, তাদের নিয়ে তিনি মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে ধর্ম নিরপেক্ষতা ছিল, তা তিনি বাতিল করেছেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের প্রশ্নে রাজনীতির মাঠে ফিরতে শুরু করেছে দুরে থাকা বিএনপির বড় একটি অংশ। এক হচ্ছে দলের মুক্তিযোদ্ধারা। ভাইস চেয়ারম্যান মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম ও ব্যারিস্টার শাহজানান ওমর বীর উত্তম, শওকত মাহমুদ সহ কোণঠাসা আরো অনেক নেতারা।

বিএনপি নেতারা বলেন, নিজেদের ব্যর্থতার জন্যই আজ সরকার সাবেক প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলে মতো সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পেয়েছে। খেতাব বাতিল সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যে দুইদিনের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। সামনে আরো বড় ধরণের কর্মসূচি আসছে। কারন সরকার দেশের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করছে, এটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়। জনগণ এখন ফুসে রয়েছে সরকার বাধা দিলে আর মানবে না। রাস্তায় নামলে দাবি আদায় করেই তবে মাঠ ছাড়বে বিএনপি। দল গোছানোর পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও চাঙা হচ্ছে। সবাই রাজপথে নামতে এখন প্রস্তুত রয়েছে। আন্দোলন সংগ্রাম ছাড়া কখনো মুক্তি মিলবে না। তাই কঠিন কর্মসূচি দিয়ে দাবি আদায় করা হবে।

তারা আরো বলেন, চলতি বছরে দল গোছানোর কাজ শেষ করার পাশাপাশি তাদের একটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে সরকারবিরোধী বড় ঐক্য গড়ে আন্দোলনে নামা। এ লক্ষ্যে বিএনপির জোটের বাইরে থাকা একাধিক দলের নেতাদের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে। দলের তৃনমূলের নেতাকর্মীরা রাজপথের রাজনীতিতে নতুন করে সক্রিয় হয়ে চাইছে। এবছরই সরকারের পতন হবে বলেও জানান নেতারা।এবিষয়ে মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, জনগনকে আর হাসাবেন না। জিয়ার খেতাব যদি বাতিল করেন তাহলে আপনি আপনার পিতাকে অসন্মান করবেন। ডোন্ট চিফ ফরগেট ইট এভার। এই খেতাব নিলো কি গেলো- কিছু আসে যায় না, তিনি মৃত এখন। খেতাব নিলেও জিয়াউর রহমান জিয়াউর রহমান থাকবেন, লক্ষ-কোটি মানুষের কাছে, অনাগত ভবিষ্যতের কাছে। এই দেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রূপেই ইতিহাসে চিহ্নিত থাকবেন তিনি। জনগনের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসন তার চির অম্লান থাকবে। খেতাব বাতিলের এখতিয়ার নেই জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। হু ইজ জামুকা। কোথায় জিয়াউর রহমান, কোথায় এগুলো।

এবিষয়ে বিএনপির আরেক ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীর উত্তম বলেন, ‘কী কারণে হঠাৎ করে জামুকা একটা প্রস্তাব করলো আমার বোধগম্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিন ধরনের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একটা হচ্ছে মিলিটারি ফোর্স, আরেকটা হলো ফ্রিডম ফাইটার, তিন নাম্বার হলো যুদ্ধের শেষ দিকে বিএলএফ নামে এটা সংগঠন গঠন করা হয়েছিলো যেটার বাংলা মুজিব বাহিনী। আমরা যারা মিলিটারি ফোর্স আমাদের কনট্রোল করে কোর নামে একটা সংস্থা আছে- সেন্টার অফিসার্স রেকর্ড অফিস। জুমকার কোনো এখতিয়ার নেই্ আমাদের মিলিটারি অফিসার যারা মুক্তিযোদ্ধা তাদের বিষয় কিছু বলা, সিদ্ধান্ত নেয়ার।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, জিয়াউর রহমানকে নিয়ে টানাটানি করলে ক্ষমতাসীনড়ের হাত পুড়ে যাবে। জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর আমরা লাশ ফেলে পালিয়ে যাইনি। কিন্তু শেখ মুজিব মারা যাওয়ার পর গোসল দেওয়ারও লোক মেলেনি। তাই জিয়াউর রহমানকে নিয়ে টানাটানি করবেন না। জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিন। মাফিয়াদের দিন শেষ হয়ে আসছে। সামনে বিএনপির দিন আসছে।

তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের খেতাব যদি বাতিল করা তাহলে আবারো ধানের শীষের জোয়ার দেখবে সরকার। এই জোয়ারে একেবারে ভেসে যাবে ক্ষমতাসীনরা। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হলে আন্দোলন-সংগ্রামের কোনও বিকল্প নাই। তাই নেতাকর্মীরা রাস্তায় নামতে প্রস্তুত রয়েছে।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন