স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই বাজারে

1021
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সারাদেশে চলছে এক সপ্তাহের লকডাউন। দিন দিন সংক্রমণ ব্যাপকহারে বাড়ায় স্বাস্থ্যবিধি মানছেনা বেশির ভাগ মানুষ।

বিশেষ করে রাজধানীর পুরান ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে এখনো গাদাগাদি করে বেচা কেনা করতে দেখা গেছে। এতে নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় থাকছে না। পাশাপাশি বেশিরভাগ ক্রেতা ও বিক্রেতাকে মাস্ক ছাড়াই বেচা কেনা করতে দেখা গেছে। অনেকের মাস্ক থাকলেও ব্যবহারে উদাসীন।

সোমবার (৫ এপ্রিল) সরেজমিনে রাজধানীর পুরান ঢাকার শ্যামবাজার, সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার, দয়াগঞ্জ, নয়াবাজার ধূপখোলা মাঠের কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজি, মাছ, মুদি, ফল বিক্রেতাসহ অধিকাংশ দোকানদারই মাস্ক ছাড়া পণ্য বিক্রি করছেন। একই সঙ্গে মাস্ক ছাড়াই কেনাকাটা করছেন ক্রেতারা। মানছেন না নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব। ক্রেতাদের কারো কারো মুখে মাস্ক থাকলেও বিক্রেতাদের বেশির ভাগের মুখে মাস্ক নেই। অনেকে মাস্ক পরলেও তা নিদিষ্ট স্থানে থেকে নামিয়ে রাখতে দেখা গেছে৷ এছাড়া বাজারে ছোট ছোট চায়ের দোকানে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। দূরত্ব বজায় না রেখেই এসব চলতে দেখা গেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করলেই চলবে না। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশে করোনা আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, করোনা রোগী বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড ও অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে গেছে। সংক্রমণের লাগাম টেনে ধরা না গেলে ভয়াবহ রূপ নেবে দেশের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি।

এ বিষয়ে সূত্রাপুর বাজারের মেসার্স বিসমিল্লাহ স্টোরের মালিক মো. রিপন বলেন, ‘লকডাউনের খবরে গত দুই দিন মানুষ আখেরি কেনাকাটা করেছে। তবে আজকে কম। মানুষকে বলেও স্বাস্থ্যবিধি মানানো যায় না। কার আগে কে সদাই নেবে সে প্রতিযোগিতায় সব কিছু ভুলে যায়। যদিও বলা হয় দূরত্ব বজায় রাখতে কিন্তু এতে কোনো লাভ হয় না। আর দূরত্ব বজায় রাখতে হলে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। তখন পাশের দোকানদারের সমস্যা হয়। আমি মাস্ক না পরলে বলি ভাই মাস্কটা পরে পণ্য নেন ও দূরত্ব বজায় রাখুন। জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হলে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে।

রায়সাহেব বাজারের মুদি দোকানদার রফিকুল বলেন, কাজের সময় স্বাস্থ্যবিধি মানা ও মানানো অনেক কঠিন। নিজে সচেতন না হলে এটা সম্ভব না। গত দুই দিন অনেক বেচা কেনা হয়েছে। এখন একটু কম। এতে পেঁয়াজ, আদা, আলু ও চালের দাম বেড়ে গেছে। তবে অন্যান্য মুদি পণ্যের দাম স্বাভাবিক রয়েছে বলেও জানান রফিকুল।

সূত্রাপুর প্যারিদাস রোডের বাসিন্দা নাজমুল বলেন, আমি প্রতিদিন সকলে কাঁচাবাজার করি। আজকে বাজারে একটু ভিড় কম। কিন্তু গত দুইদিন মানুষ প্রচুর কেনাকাটা করেছে। ফলে জিনিস পত্রের দাম বেড়ে গেছে৷ ভিড় কম থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না অনেকেই। অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করছেন না, আবার দোকানগুলোও নিদিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছে না।

তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা মানার জন্য প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো সাধারণ মানুষ এভাবেই চলবে। করোনা বাড়লেও অনেকের সংক্রমণের ভয় নেই। তাদের বাধ্য করতে হবে। চায়ের দোকানগুলোতে অযথা আড্ডা বন্ধ করতে হবে।

এদিকে লকডাউনের খবরে বাজারে বেড়েছে বিভিন্ন পণ্যের দাম। বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, তিনদিন আগের ১৮ থেকে ২০ টাকায় যে আলু বিক্রি হতো এখন সেই আলু প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ২৩ থেকে ২৫ টাকা দরে। ৩৫ টাকার পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়, ৬০ টাকা কেজির আদা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা দরে। একই সঙ্গে দাম বেড়েছে সব ধরনের চালের। বিক্রেতারা প্রতিকেজি চালে ২ থেকে ৩ টাকা বেশি নিচ্ছেন। পাশাপাশি বেড়েছে ডিমের দাম। গত সপ্তাহে প্রতি হালি ডিম ২৮ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৩২ থেকে ৩৫ টাকা হালি।

এ বিষয়ে রায়সাহেব বাজারের আলু, পেঁয়াজ আদা, রসুন বিক্রেতা বলরাম পোদ্দার বলেন, দাম বাড়লে আমরা কি করবো। আমরা আড়ৎ থেকে বেশি দামে পণ্য কিনে বেশি দামে বিক্রি করি। তিনদিন আগে যে আলু ১৮ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন বাধ্য হয়ে ২২ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ৩৫ টাকার পেঁয়াজ ৪০ টাকা, ৫০ টাকার আদা ১১০ টাকা হয়েছে। আমাদের কিছু করার নেই। সাধারণ মানুষও লকডাউনের খবর শুনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বাজারে। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেছে। আর চাহিদা বাড়লে দামও বেড়ে যায়।

এদিকে সরকারের ৫ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউনের ঘোষণার পর থেকেই রাজধানীসহ সারাদেশের বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি বেড়েছে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুদ করছে। এজন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিত্যপণ্য না কেনার আহ্বান জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানিয়েছে, এ বছর নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি থাকার কারণে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম বাড়িয়েছে টিসিবি। রমজানে যেসব পণ্যের বেশি চাহিদা থাকে, সেগুলোর ১০ থেকে ১২ শতাংশ টিসিবির মজুদ রয়েছে। রমজান উপলক্ষে সংস্থাটি সাশ্রয়ী মূল্যে ২৬ হাজার ৫০০ টন ভোজ্যতেল, ১৮ হাজার টন চিনি, ১২ হাজার টন মসুর ডাল, আট হাজার টন ছোলা, ছয় হাজার টন পেঁয়াজ বিক্রি করবে।

এছাড়া রমজান উপলক্ষে ট্রাকসেলের সংখ্যা বাড়িয়ে  ৫০০টি করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে পণ্য বিক্রি করবে ১০০টি ট্রাক। এসব পণ্য ১ এপ্রিল থেকে ই-কমার্সের মাধ্যমেও বিক্রি করবে সংস্থাটি। কেউ ট্রাক থেকে না কিনলে ই-কমার্স অথবা সরাসরি বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমেও এসব পণ্য কিনতে পারবেন।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন