খালেদা জিয়াকে বড় দুশ্চিন্তায় বিএনপি

893
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

মো. শফিকুল ইসলাম: করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ৭৬ বছর বয়সী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বড় দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে দলটি। কারণ মহামারি ভাইরাসটিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে প্রবীনরা। নানাবিধ রোগে আক্রান্ত খালেদা জিয়ার শরীরে ভাইরাসটির অবস্থান দ্বিতীয় সপ্তাহে। এই সময় যেকোনো করোনা রোগীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।
ফিরোজা বাসায় ১০ সদস্য বিশিষ্ট মেডিকেল টিমের পরামর্শে চলছে চিকিৎসা। তবে আগাম সতর্কতা অবলম্বনে বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বুকিং করে রাখা হয়েছে। তাই দলীয় প্রধানের সম্ভব্য পরিণতি নিয়ে চিন্তিত দলের নেতাকর্মীরা। দলের হাতে গোনা দুয়েকজন ছাড়া শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাই করোনায় আক্রান্ত। এছাড়া প্রতিদিন করোনার মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে সেখানে কখন কার নামযুক্ত হয়, তা নিয়ে শঙ্কিত দলের হাইকমান্ড। এমন পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে মহাবিপাকে রয়েছে বিএনপি। এমনটি জানিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের দিক থেকেও খালেদা জিয়াকে নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছে বিএনপি। তার বয়স, শারীরিক অবস্থা— সব মিলিয়ে যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার ব্যাপারে প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তুলেছে দলের নেতাদের। গত তিন বছর ধরে কারাগার ও গুশানে ফিরোজায় বদ্ধ জায়াগায় প্রায় একাকী জীবন করেছেন। তাই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ নানাবিধ কারণেই তাকে নিয়ে বাড়তি চিন্তা করতে হচ্ছে বিএনপি নেতাদের।

বিএনপির নেতৃবৃন্দ বলছেন, খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও তাকে সামনে রেখেই সরকার পতনের আন্দোলনে এগোচ্ছে বিএনপি। কিন্তু এই সময়ে হঠাৎ কিছু হয়ে গেলে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। দলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে হার মেনেছেন। করোনায় এতো নেতারা মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই খালেদা জিয়ার আক্রান্তের খবর বিএনপিকে মহাটেনশনের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এখন সব কিছু ফেলে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা এবং আশু করোনামুক্তির জন্য প্রার্থনায়রত রয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।

জানা গেছে, টানা দুই বছর আইনি লড়াই চালিয়েও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হয় বিএনপি। কিন্তু গত বছর দেশে মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে মানবিক দিক বিবেচনা করে নিবাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে ৬ মাসের জন্য সাময়িক মুক্তি দেয় সরকার। সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার ‘সাময়িক’ মুক্তির পেছনে সব চেয়ে বড় কারণটি ছিল তাকে করোনা ঝুঁকিমুক্ত রাখা। তখন হাসপাতালে না রেখে ৭৫ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে বাসায় পাঠানো হয়েছিল করোনার ঝুঁকি কমাতে— এ বিষয়টি বিএনপির কাছে পরিষ্কার। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। মুক্তির ১ বছর ১৫ দিনের মাথায় গত ১০ এপ্রিল বেগম খালেদা জিয়ার শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তার বাসার নয়জন করোনা পজিটিভ।

অবশ্য এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত দিক নিয়ে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকেরা ‘ভালো’ খবরই দিয়ে যাচ্ছেন বিএনপিকে। সিটি স্ক্যান রিপোর্টও ভালো এসেছে। জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দিন পরিবর্তনকে বলেন, ম্যাডামের অবস্থা স্থিতিশীল আছে। সিটি স্ক্যানের ফাইনাল রিপোর্ট মিনিমাম ইভলমেন্টের কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে আমরা রিপোর্টি পর্যালোচনা করেছি। রিপোর্ট পর্যালোচনার আগের ওষুধের সঙ্গে আরেকটি ওষুধ যোগ করা হয়েছে।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক টিমের প্রধান ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, খালেদা জিয়া অবস্থা খুবই স্থিতিশীল। আজকে পর্যন্ত উনি যথেষ্ট ভালো আছেন। উনি স্পিরিটেড আছেন। আমরা আশা করছি, যদি এভাবে আরো এক সপ্তাহ পার হওয়া যায়, তাহলে আমরা বিপদমুক্ত হয়ে যাব।

তিনি বলেন, কোভিডে আনসারটেনিটি আছে। পৃথিবীর কেউ বলতে পারবে না যে, করোনা প্রথম সপ্তাহে কেমন থাকবে, সেকেন্ড উইকে কি বিহ্যাব করবে। উনি আজ সেকেন্ড উইকে প্রবেশ করছেন। আজ কিছুটা জ্বর জ্বর ভাব দেখা দিয়েছে। আমরা সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছি।’

এদিকে যে কোনো ইস্যুতে সমর্থন বা সমবেদনা জানাতে খালেদা জিয়ার বাসা বা অফিসের সামনে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী জড়ো হলেও করোনা ইস্যুতে সেই সুযোগ নেই। সে কারণে গত বৃহস্পতিবার রাতে বাসা থেকে বেরিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে সিটি স্ক্যান করতে গেলে রাস্তার দুই পাশে দলের নেতাকর্মী সমর্থকেরা ভিড় করতে পারেনি। বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়ে পাশে দাঁড়ালে খালেদা জিয়া তাকে মৃদু ভৎর্সনা করেন।
দলীয় সূত্রমতে, শুধু ওই একজন ভাইস চেয়ারম্যান নন, দলের প্রত্যেকটা নেতাকর্মী সমর্থক চান- খালেদা জিয়ার পাশে থাকতে, তার প্রতি সমর্থন ও সমবেদনা জ্ঞাপন করতে। কিন্তু নিজের এবং খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে সবাই মোটা-মুটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া-প্রার্থনা-শুভকামনা অব্যাহত রেখেছেন বিএনপির নেতাকর্মী সমর্থকেরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক তো বটেই এ দেশের সাধারণ মানুষ, দলমত নির্বিশেষে সবাই বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভালোবাসেন, পছন্দ করেন। এ দেশে অসংখ্য মানুষ আছেন, মা-বোনেরা আছেন, যারা খালেদা জিয়ার জন্য নফল রোজা রাখেন, দোয়া করে।
তিনি বলেন, বড় দুশ্চিন্তা তো বটেই। যে দুরবস্থার মধ্যে যাচ্ছে গোটা পৃথিবী, সেখানে আমরা কেউ নিরাপদ নই। আমাদের দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও আক্রান্ত হয়েছেন। তবে আশার বিষয় হলো— তিনি এখন পর্যন্ত স্ট্যাবল আছেন, সুস্থ আছেন। আশা করছি দ্রুত সেরে উঠবেন।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন