শ্রদ্ধাঞ্জলি সি আর দত্ত বীর উত্তম: আশীষ কুমার দে

999
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

চিত্ত রঞ্জন দত্ত; যিনি সি আর দত্ত নামে দেশে-বিদেশে পরিচিত। এছাড়া নামের আগে সামরিক পদবি মেজর জেনারেল (অব.) রয়েছে। তবে এর চেয়ে অনেক বড় খ্যাতি হলো- মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন ৪ নং সেক্টরের কমান্ডার। একাত্তরের রণাঙ্গনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘বীর উত্তম’ খেতাবও পেয়েছেন দেশমাতৃকার এ সূর্যসন্তান। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রয়াণ দিবসে এই বীর সেনানীর অমর স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা।

পৈতৃকনিবাস হবিগঞ্জ জেলার (তৎকালীন সিলেট বা শ্রীহট্ট জেলা) চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশী গ্রামে হলেও চিত্ত রঞ্জন দত্তর জন্ম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি, আসামের শিলংয়ে তাঁর বাবার চাকরিস্থলে। বাবার নাম উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং মায়ের নাম লাবণ্য প্রভা দত্ত। মিরাশী গ্রামটি অসংখ্য গুণীজনের স্মৃতিবিজড়িত। এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বৃটিশ আমলের শিক্ষামন্ত্রী রায়বাহাদুর এডভোকেট প্রমোদ চন্দ্র দত্ত, সিলেট বিভাগের প্রথম গায়িকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্যা অমলা দত্ত কুইনী, রায়সাহেব মহেন্দ্র দত্ত, কলকাতা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল সুপ্রভা দত্ত, বিশ্বনন্দিত গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমুখ।

শিলংয়ের লাবান গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে শুরু হয় চিত্ত রঞ্জন দত্তর শিক্ষাজীবন এবং সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। তাঁর বাবা চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর সপরিবারে হবিগঞ্জ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৪৪ সালে হবিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করে কলকাতার আশুতোষ কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন তিনি। সেখানে অধ্যায়ন শেষ না করে চিত্ত রঞ্জন দত্ত খুলনায় এসে দৌলতপুর ব্রজলাল (বি এল) কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৪৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৪৮ সালে বিএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৫১ সালে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে।

চিত্ত রঞ্জন দত্ত ১৯৫৭ সালে মাধবপুর থানার বেঙ্গাডুবা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে মনীষা রাণী রায়কে বিয়ে করেন। শিক্ষাজীবনে মনীষা হবিগঞ্জ শহরে ব্রিটিশবিরোধী মিছিল করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন কারাবন্দি ছিলেন। তাঁর বাবা (সি আর দত্তের শ্বশুর) সাংবাদিক অনিল কুমার রায় ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের একান্ত সচিব (পিএস)।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা সি আর দত্ত ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে ভারতের বিপক্ষে একটি কোম্পানির নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার তাঁকে পুরস্কৃত করেছিল। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে ৬ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সে কর্মরত ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ছুটিতে এসে হবিগঞ্জ শহরের বাসায় অবস্থান করেছিলেন। একাত্তরের ২৭ মার্চ কর্ণেল এম এ রবের নেতৃত্বে একদল মুক্তিকামী মানুষ ৫২০টি রাইফেল ও ১৭ হাজার ৭৩৮ রাউন্ড গুলি লুট করে হবিগঞ্জ ট্রেজারির অস্ত্রভাণ্ডার খালি করে ফেলেছিল।

সেদিনই কর্ণেল এম এ রব মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য মেজর সি আর দত্তকে খবর পাঠালে সি আর দত্ত সঙ্গে সঙ্গে চলে আসেন। তাঁর আগমনে উপস্থিত জনতা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে আনন্দ-উল্লাস করতে থাকে। জনগণের সেই উচ্ছ্বাসে তিনি উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। মেজর সি আর দত্ত হাত তুলে সবাইকে অভিবাদন জানান। ট্রেজারির লুন্ঠিত অস্ত্রসহ হবিগঞ্জের মুক্তিপাগল মানুষদেরকে নিয়ে সেদিন বিকেল পাঁচটায় সিলেটের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। শেরপুর, সাদিপুরের যুদ্ধে মেজর সি আর দত্তের হবিগঞ্জের এই বাহিনী পাকিস্তানি শত্রুর বিরুদ্ধে প্রথম সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয়। ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানায় তেলিয়াপাড়া চা বাগানে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য এক গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৭ জন সেনা কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে।

তাঁদের মধ্যে ছিলেন- কর্ণেল এম এ জি ওসমানী, কর্ণেল এম এ রব, লে. কর্ণেল সালাউদ্দিন মোহাম্মাদ রেজা, মেজর কে এম শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর চিত্ত রঞ্জন দত্ত, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন নাসিম, ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুইয়া, ক্যাপ্টেন মইনুল হোসেন চৌধুরী, ক্যাপ্টেন মতিন, লে. মাহবুব, লে. আনিস, লে. সেলিম, লে. কাজী কবীর উদ্দিন, ভারতীয় বিএসএফ প্রধান খসরু এফ রুস্তমজী, ভারতের পুর্বাঞ্চলীয় বি এস এফের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার ভিসি পান্ডে, আগরতলার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ওমেস সায়গল।

১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেব দায়িত্ব দেয়া হয় এম এ জি ওসমানীকে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। তৎকালীন হবিগঞ্জ মহাকুমাসহ সিলেটের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয় ৪ নং সেক্টর। সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই শায়স্তাগঞ্জ রেল লাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট ডাউকি সড়ক পর্যন্ত এলাকা ছিল এই সেক্টরের অধীনে। মেজর চিত্ত রঞ্জন দত্ত ৪ নং সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পান।

সি আর দত্ত ৪ নং সেক্টরের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমে সিলেটের রশীদপুরে ক্যাম্প তৈরি করেন। চারপাশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চা বাগান। বাগানের আড়ালকে কাজে লাগিয়ে তিনি যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে দিতেন। তাঁর নেতৃত্বে ১,৫০০ নিয়মিত সৈন্যর পাশাপাশি প্রায় ৯ হাজার গণযোদ্ধা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আক্রমণের সুবিধার্থে রশীদপুর ছেড়ে মৌলভীবাজারে ক্যাম্প স্থাপন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ধংসাত্মক কার্যাক্রম শুরু করে। মেজর সি আর দত্ত দুটি পদাতিক ডিভিশন থেকে অতিরিক্ত সেনা এনে মোতায়েন করেন। রশীদপুর চা বাগানে সামরিক ঘাটি স্থাপন করে প্রতিরোধযুদ্ধ চালাতে থাকেন।

১৯৭২ সালে সি আর দত্ত রংপুরে ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালে সরকার ‘সীমান্ত রক্ষা বাহিনী’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে তাঁকে দায়িত্ব দেয় সরকার। তিনি সীমান্ত রক্ষা বাহিনী গঠন করেন এবং নাম দেন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর); যাঁর প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন তিনি। বর্তমানে এই বাহিনীর নাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি। সি আর দত্ত ১৯৭৪ সালে হেড কোয়ার্টারে চিফ অব লজিস্টিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তিনি। বিআরটিসির চেয়ারম্যান হন ১৯৭৯ সালে। ১৯৮২ সালে পুনরায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হন। স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে ১৯৮৪ সালে মেজর জেনারেল পদে থাকা অবস্থায় বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয় তাঁকে।

১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকার সংবিধানের ৮ম সংশোধনীর পাস করলে এর বিরুদ্ধে যেসব বিশিষ্ট নাগরিক তীব্র প্রতিবাদমুখর ছিলেন তাঁদের মধ্যে সি আর দত্ত ছিলেন প্রথম সারির একজন। এ কারণে রাষ্ট্রপতি এরশাদের সমর্থক গুন্ডা বাহিনী মেজর জেনারেল সি আর দত্তের গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে গুরুতর আহত হন তিনি। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা হয় তাঁকে। একই বছর (১৯৮৮) গঠিত হয় বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদ; যার মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ১৯৭২ সালের সংবিধান বাস্তবায়ন করা। তিনি ছিলেন সংগঠনের আজীবন সভাপতি। ২০১০ সালের ১৪ নভেম্বর সি আর দত্তের স্ত্রী মনীষা দত্ত মারা যান। স্ত্রীবিয়োগের পর ঢাকার বনানীর বাসায় একাকী হয়ে পড়েন তিনি।

সি আর দত্ত ২০২০ সালের ২০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মেয়ের বাসায় অবস্থানকালে বাথরুমে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। স্বজনরা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান তাঁকে। কিন্তু অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে এবং কোমায় চলে যান তিনি। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টায় জীবনাবসান ঘটে মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানীর। সি আর দত্তের ইচ্ছে ছিল, প্রিয় মাতৃভূমিতেই যেন তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তাঁর মরদেহবাহী এমিরেটস এয়ার লাইন্সের বিমানটি ৩১ আগস্ট সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখান থেকে সি আর দত্তের মরদেহ ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) হিমঘরে রাখা হয়।

সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্তের মরদেহ ১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭টায় প্রথমে বনানী ডিওএইচ এর ২ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গনে। সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করা হয় তাঁর মরদেহে। ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে মরদেহ নেওয়া হয় সবুজবাগের রাজারবাগ বরদেশ্বরী শ্মশানে। সেখানে শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আগে গানস্যালুট প্রদান করে মেজর জেনারেল সি আর দত্তের মরদেহের প্রতি সামরিক সম্মান জানানো হয়। সেখানেই সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য।

সি আর দত্তের তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছেন। তাঁরা হলেন ব্যারিস্টার চয়নিকা দত্ত, মহুয়া দত্ত ও কবিতা দত্ত এবং চিরঞ্জীব দত্ত। চয়নিকা দত্ত কানাডাপ্রবাসী। অন্য তিনজন বসবাস করেন আমেরিকায়। এই বীরের অমর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে রাজধানী ঢাকার কাঁটাবন থেকে কারওয়ান বাজার সিগন্যাল পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বীরউত্তম সি আর দত্ত সড়ক’। কিন্তু দেশমাতৃকার এই সূর্যসন্তানের নামে জাতীয়ভাবে আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।

আশীষ কুমার দে: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন