মসজিদের ছাদে দাঁড়িয়ে সিনহা হত্যার ঘটনা ‘দেখেন’ মুয়াজ্জিন

1364
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় দ্বিতীয় দফার ৩য় দিনে ৫ম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। এ নিয়ে মামলার ৮৩ সাক্ষীর মধ্যে ৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হলো। মঙ্গলবার (০৭ সেপ্টেম্বর) মামলার পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি দিয়েছেন ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. আমিন। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, মো. আমিন মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিক।

আর আসামিপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার অন্যতম আসামি বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে বিধি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য কারা কর্তৃপক্ষের প্রতি আদেশ দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার বিকেলে জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালতে মামলাটির দ্বিতীয় দফায় তৃতীয় দিনে পঞ্চম সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম।

মামলায় পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি দিয়েছেন ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. আমিন।

তদন্ত প্রতিবেদনে মো. আমিনকে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকার বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, তিনি (নুরুল আমিন) মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিক। এমনকি আদালতে স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে নিজেকে প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন।

এর আগে গত ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত মামলার প্রথম দফায় সাক্ষ্য দেন মামলার বাদী ও সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস এবং ২ নম্বর সাক্ষী ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে একই গাড়িতে থাকা সঙ্গী সাহেদুল ইসলাম সিফাত। এছাড়া রোববার থেকে শুরু হওয়া সাক্ষ্যগ্রহণের দ্বিতীয় দফায় তৃতীয় দিন পর্যন্ত জবানবন্দি দিয়েছেন আরও তিনজন সাক্ষী। এতে মামলায় আরও ৭৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ বাকি রয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মামলার ১৫ আসামিকে প্রিজনভ্যান করে কড়া পুলিশ পাহারায় আদালতে আনা হয়।

পিপি ফরিদুল বলেন, সকাল ১০টা ১৪ মিনিটে আদালতে বিচার কাজ শুরু হয়। এতে মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দ্বিতীয় দফায় তৃতীয় দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. আমিন জবানবন্দি প্রদান করেছেন। এ পর্যন্ত ৮৩ জন সাক্ষীর মধ্যে পাঁচজনের জবানবন্দি এবং আসামিদের আইনজীবীর জেরা সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি বলেন, সকাল ১১টা ১৯ মিনিটে নুরুল আমিনের জবানবন্দি প্রদান শেষ হয়। এরপর আসামিদের আইনজীবীরা তাকে জেরা শুরু করেন। দুপুর ২টায় আদালত বিচার কাজ ১ ঘণ্টার জন্য বিরতি দেন। পরে আবারও বিচার কাজ শুরু তাকে আইনজীবীরা জেরা শেষ করেন বিকেল ৫টায়।

রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, সিনহা হত্যা ঘটনার তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির প্রতিবেদন মামলায় রেফারেন্স উল্লেখ করার আসামি ওসি প্রদীপের আইনজীবীর বক্তব্যটি বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে প্রাসঙ্গিক না হওয়ায় আদালত সেটি বিবেচনায় নেননি।

‘তবে ওসি প্রদীপের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে বিধি অনুযায়ী যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন তাকে ( প্রদীপকে ) তা প্রধানের জন্য জেল সুপারকে ব্যবস্থা নিতে আদালত আদেশ দিয়েছেন,’ বলেন, ফরিদুল।

রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী জানান, বুধবার মামলায় দ্বিতীয় দফায় শেষ দিনে ষষ্টতম সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করবে আদালত।

বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, সিনহা হত্যা ঘটনার পরদিন ছিল ঈদুল আজহা। আকাশে চাঁদ ওঠার বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী বায়তুল নুর জামে মসজিদের ছাদে অবস্থান করছিলেন মুয়াজ্জিন নুরুল আমিন। এ সময় মসজিদের ছাদ থেকে তিনি (মো. আমিন) ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন।

‘ঘটনাটি মসজিদ ছাদ থেকে মো. আমিন যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন আদালতে সেইভাবে উপস্থাপন করেছেন,’ বলেন, বাদীপক্ষের এ আইনজীবী।

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত দাবি করেন, ‘মূলত শামলাপুর যে রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে তিনি সেটার বাসিন্দা এবং মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিক মো. আমিন। আদালতে আমরা বলেছি, যেহেতু সে (মো. আমিন) বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এবং সেখান (ক্যাম্প) থেকে বের হতে গেলে অনুমতির দরকার পড়ে। সেটা তার নাই এবং সে দেখাতেও পারেনি। তাই আদালতে যা বলেছেন, সবটাই মিথ্যা।’

মামলায় পঞ্চম সাক্ষী মো. আমিন বিদেশি নাগরিক হয়েও আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন এটার কোনো আইনগত অধিকার নেই বলে দাবি করেন রানা দাশগুপ্ত।

তবে আসামি ওসি প্রদীপের আইনজীবীর এ বক্তব্যের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর।

জাহাঙ্গীর বলেন, ‘নুরুল আমিন বাংলাদেশি নাগরিক। তারপরও তর্কের খাতিরে বলি, রোহিঙ্গা নাগরিক হলেও তার (মো. আমিন) কি কোনো চোখ নেই। আইনে তো একটা মার্ডারের ঘটনা দেখতে নিষেধাজ্ঞা নেই। আসামির আইনজীবীরা জেরার খাতিরে জেরা করে ভিন্নতা আনার চেষ্টা করেছেন।’

‘মো. আমিন তো সাক্ষী দিয়েছেন হলফ পূর্বক। সে নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে দাবি করেছেন। তা (বাংলাদেশি নাগরিক) দেখেই তো মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব দিয়েছেন।’

‘গ্রামের মসজিদ। গ্রামের মসজিদে তো কমিটি-টমিটি থাকে না। ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেখানটা তো গ্রাম। তিনি (মো. আমিন) হলফ পূর্বক সাক্ষী দিয়েছেন। অনেক জেরার পরেও মূল ঘটনা থেকে তাকে এক সুতাও নাড়তে পারেনি,’ বলেন বাদীপক্ষের এ আইনজীবী।

গত বছর ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।

এ ঘটনায় গত বছর ৫ আগস্ট সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্ত সাবেক ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় লিয়াকত আলীকে। আদালত মামলার তদন্ত ভার দেওয়া হয় র‌্যাবকে।

ঘটনার ৬ দিন পর ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকতসহ ৭ পুলিশ সদস্য আত্মসমপর্ণ করেন।

ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় একটি এবং রামু থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
পরে র‌্যাব পুলিশের দায়ের মামলার ৩ সাক্ষী এবং শামলাপুর চেকপোস্টে দায়িত্বরত আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ানের (এপিবিএন) এর ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় টেকনাফ থানা পুলিশের সাবেক কনস্টেবল রুবেল শর্মাকে। সর্বশেষ গত ২৪ জুন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন টেকনাফ থানার সাবেক এএসআই সাগর দেব।

গত বছর ১৩ ডিসেম্বর র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়ানের তৎকালীন দায়িত্বরত সহকারি পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। গত ২৭ জুন আদালত ১৫ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এতে সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন