বিএনপি’র প্রথম দিনের বৈঠকে কী আলোচনা হলো?

830
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন বিএনপি নেতারা। একইসংগে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে যাওয়া এবং নির্বাচনের আগে সরকারের সংগে কোনো সমঝোতায় না যাওয়ার বিষয়ে মত দিয়েছেন তাঁরা।

মঙ্গলবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সংগে দলের সিনিয়র নেতাদের সংগে ধারাবাহিক বৈঠকের প্রথম দিন এই মতামত দেওয়া হয়।

বিকাল চারটা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার এই বৈঠক হয়। দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মিলে উপস্থিত ৬২ জনের মধ্যে ২৮ জন বক্তব্য রাখেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য শোনেন এবং তাঁদেরকে আশ্বস্ত করেন। এক দফার আন্দোলন শুরু হলে দলের সবাইকে তিনি রাজপথে দেখতে চান তিনি।

সূত্র আরও জানিয়েছে, বিএনপি’র সিনিয়র নেতারা তাঁদের বক্তব্যে বলেছেন, প্রতিবারের মতো এবারও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার নানান ফন্দি আঁটবে, কৌশল করবে। কিন্তু দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। দলকে এক দফার আন্দোলনে নিয়ে যেতে হবে।

এর পাশাপাশি দল পুনর্গঠন, চেয়ারপারসনের মুক্তি, জোটের রাজনীতি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলাসহ সাম্প্রতিক নানান ইস্যুও উঠে আসে বৈঠকে।

সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়, নিরপেক্ষ ব্যক্তি নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন এবং দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে অধিকাংশ নেতা আন্দোলন জোরদার করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। কেউ কেউ দলের অঙ্গসংগঠনগুলো বিশেষ করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলকে আন্দোলনমুখী নেতৃত্বে পূর্ণগঠনের কথা বলেন।

বৈঠকে জামায়াত বিষয়ে একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও দুইজন উপদেষ্টা বক্তব্য রাখেন। তাঁরা বলেন, জামায়াত বিষয়ে আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ, এই নিয়ে গণমাধ্যমে প্রায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই কারণে দল হিসেবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এই বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোনো কথা বলেননি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী আন্দোলনে জামায়াতকে সংগে নিয়েই মাঠে নামবে বিএনপি। আলোচনা এসেছে গত নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা নিয়ে।

বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসনের একজন উপদেষ্টা বলেন, সবকিছু ঠিক করে আন্দোলনে নামা যায় না। আন্দোলন শুরু হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। দল পুনর্গঠন শেষ করে আন্দোলনে নামতে হবে এটার কোনো মানে নেই। আন্দোলনের পাশাপাশি পুনর্গঠনও চলবে। আন্দোলনের পক্ষে প্রস্তুত হলে জনগণও আমাদের সংগে রাজপথে আসবে। তাই আন্দোলনের সূত্রপাতটা বিএনপিকেই করতে হবে। সরকারের কর্মকাণ্ডে অনেকেই ক্ষুব্ধ। আমরা নামলে অন্যরা যার যার অবস্থান থেকে রাজপথে নামবে। সবার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেই এই সরকারকে বিদায় করা সম্ভব।

বৈঠকে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভাইস চেয়ারম্যান সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে জোরালো বক্তব্য রাখেন। একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, সরকারকে চ্যাংদোলা করে গদি থেকে নামাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।

এছাড়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকল অংগ ও সহযোগি সংগঠনের কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি উঠে আসে বৈঠকে।

ধারাবাহিক এই বৈঠকের অংশ হিসেবে বুধবার নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব, যুগ্ম-মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহসম্পাদক এবং শেষদিন কাল বৃহস্পতিবার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেবেন। বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের এই বৈঠকের পর দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হবে, পরে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সংগেও একই প্রক্রিয়ায় বৈঠকের সিদ্ধান্ত রয়েছে। সবার মতামতের পরই চূড়ান্ত করা হবে আন্দোলনের কৌশল।

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণে দলের করণীয় সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতামত নিয়েছেন তারেক রহমান। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর বেশি কিছু এখন বলার নেই।

মহাসচিব জানান, দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে আমাদের কী করণীয় সে বিষয়ে নেতাদের মতামত নিতে এই বৈঠক ডাকা হয়েছে। বুধ ও বৃহস্পতিবার বৈঠকের পর তিন দিনের বৈঠক নিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে গণমাধ্যমকে।

প্রথম দিনের বৈঠকে ভাইস চেয়ারম্যানদের ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীর উত্তম, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, মীর নাসির উদ্দিন, মে. জে. (অব.) মাহমুদুল হাসান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, শওকত মাহমুদ এবং উপদেষ্টা সদস্যদের মধ্যে মনিরুল হক চৌধুরী, মশিউর রহমান, আমান উল্লাহ আমান, মিজানুর রহমান মিনু, হাবিবুর রহমান হাবিব, লুতফর রহমান খান আজাদ, আবদুস সালাম, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, ফজলুর রহমান, শাহজাহান মিয়া, সুকোমল বড়ুয়া, খন্দকার মুক্তাদির আহমেদ, এসএম ফজলুল হক, আবদুল হাই, ভিপি জয়নাল আবেদীন, গোলাম আকবর খন্দকার, অধ্যাপক শাহেদা রফিক, আফরোজা খানম রীতা, তাহসিনা রুশদীর লুনা, অধ্যাপক তাজমেরী এস ইসলাম, ইসমাইল জবিউল্লাহ, এরামুজ্জামান, তৈমুর আলম খন্দকার, মইনুল ইসলাম শান্ত, মাহবুবুর রহমান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, আবদুল হাই শিকদার, আতাউর রহমান ঢালী, বোরহান উদ্দিন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, নাজমূল হক নান্নু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দফতরের সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, বেলাল আহমেদ ও চেয়ারপারসন কার্যালয়ের এবিএম আবদুস সাত্তার ও রিয়াজ উদ্দিন নসু ছিলেন অনুষ্ঠানে।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর খালেদা জিয়া’র নেতৃত্বে গঠিত হয় ৫০২ সদস্যের নির্বাহী কমিটিতে ৩৫ জন ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলে সদস্য সংখ্যা হচ্ছে ৮২ জন।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন