পাচারকারীদের নৃশংসতা যেন আদিম যুগকেও হার মানাচ্ছে!

736
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

চারকারীদের নৃশংসতা যেন আদিম যুগকেও হার মানাচ্ছে!
পশুর হাটের মতো চলে মানুষ কেনাবেচা। এক মালিকের হাত ঘুরে আরেক মালিকের কাছে পাঠানো হয় তরুণী ও কিশোরীদের। যেখানে তাদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। চাকরির কথা বলে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে পাচার হওয়া ভুক্তভোগী ইয়াসমিনের মর্মান্তিক স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে এমন লোমহর্ষক ঘটনা।

ভিডিও বার্তায় দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তিনি বলেন, ‘গরু যে বেচাকেনা করে, হেইরম (সেভাবে) আমারেও গরুর মতো বিক্রি শুরু করেছে। যেদিন মালিক আহে, হেইদিন (সেদিন) যদি দাম বেশি হয় তাইলে নেয় না, আর দাম কম হইলে নেয়।’

একবিংশ শতাব্দি শেষ হলেও পাচারকারীদের নৃশংসতা যেন আদিমযুগকেও হার মানায়। ভাগ্য ফেরানোর কথা বলে হতদরিদ্র ইয়াসমিনকে গত বছরের নভেম্বরে সৌদি আরবে পাঠানো হলেও আসলে তাকে বিক্রি করা হয় অন্ধকার জগতে।

এদিকে, জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, গেল ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ নারী ও শিশুকে পাচার করা হয়েছে।

পাচারের শিকার সাভারের জামসিং গ্রামের তাসলিমা আক্তার। গ্রামটিতে থাকা তিন দালাল মোতালেব, লিনা আর আজিজ ভাগ্য বদলানোর কথা বলে তরুণীটিকে পাচার করে দেয় ভারতে। সিআইডির সহায়তায় দেশে ফিরলেও পাচারকারীরা উল্টো তাসলিমার বাবার নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। প্রতিনিয়ত তাদের দেয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি।

তাসলিমা জানান, বিউটি পার্লারে কাজের কথা বলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। আর বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য করাতে পাচারকারীদের একজনের মেয়েও সেখানকার বিউটি পার্লারে কাজ করে বলে জাননো হয়। এমনকি ওই মেয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে তাসলিমা ও তার পরিবারের লোকজনের কথাও বলিয়ে দেন পাচারকারীরা। এরপর আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে পাচারকারীরা সরাসরি তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর দেশ ছাড়ার পর ভাগ্যের দুরবস্থা টের পান তিনি।

এরপর দেশে ফিরে এলেও পাচারকারীদের করা মামলায় উল্টো কারাগারে যেতে হয় তাসলিমার বাবাকে। সেই মামলায় চার মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে এই বৃদ্ধকে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে যেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, ‘মামলা দিয়া চাইর মাস জেল খাটাইছে। এই বয়সে জেল খাইটা শরীর দুর্বল হইয়া গেছে। এহন মামলা চলতাছে। আরও কইতাছে বাড়িঘর থাকব না, আরও হুমকি দিতাছে। আমার কষ্টের আর সীমা নাই।

শুধু পাশবিক নির্যাতনই নয়, ভারতে পাচারের শিকার আরেক ভুক্তভোগী জায়দাকে দেশটির কারাগারে ১০ মাস বিনা দোষে কারাগারে থাকতে হয়। তিনি জানান, সীমান্তে তাকে মারধর করে ফেলে রেখে যায় পাচারকারীরা। এরপর সেখান থেকে বিএসএফ তাকে ধরে তারাও মারধর করে। এর একদিন পর তাকে ভারতের কৃষ্ঞনগর কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তিনি ১০ মাস বন্দি অবস্থায় ছিলেন। এসব ভুক্তভোগীদের একটাই দাবি, ন্যায়বিচার।

জানা যায়, দেশের ১৮টি জেলায় সক্রিয় নারী ও শিশু পাচারকারীরা। যশোর ও সাতক্ষীরাসহ সীমান্তবর্তী জেলার ১৯টি পথে পাচারের ঘটনা ঘটছে সবচেয়ে বেশি। গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, কলকাতা, হায়দ্রাবাদ, মুম্বাই ও পুনেভিত্তিক একটি নারী পাচার চক্র বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভারতীয় এ পাচারকারী চক্র স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে নারীদের সংগ্রহ করে। একেকজনের জন্য দেয়া হয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘দালালদের আত্মীয়স্বজন গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষ খুঁজে নিয়ে আসে। যেসব দেশ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেখানে কিছু দালাল থাকে অন্য ভাষাভাষীর- তারাও এর একটি অংশ। এ ছাড়া যেসব দেশে পাচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে থাকা বাংলাদেশি এবং সরকারি ও স্থানীয়রা মিলেই বড় একটি চক্র তৈরি করেছে।’

মানবপাচার প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার আইন প্রণয়ন করে

শেয়ার করতে ক্লিক করুন