খালেদার মাদার অব ডেমোক্রেসি সম্মাননা নিয়ে যা বললেন নেতারা

890
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মাদার অব ডেমোক্রেসি সম্মাননা নিয়ে দলেই আছে নানা কথা। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলছেন, সম্মাননা দেওয়া কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন নিয়ে সন্দেহ ছিল তাদের।

প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে খোঁজখবর করতে সাড়ে তিন বছর সময় নেয় দলটি। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সেলিমা রহমান মনে করেন, পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি জনসমক্ষে আনতে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কেন এত দেরি হয়েছে, তা যাচাই করা উচিত।

গণতন্ত্র রক্ষায় অবদানের জন্য বেগম জিয়াকে কানাডিয়ান একটি সংস্থা মাদার অব ডেমোক্রেসি সম্মাননা দেওয়ার বিষয়টি গত ৮ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন বিএনপির মহাসচিব। ওই দিন সন্ধ্যায় চেয়ারপারসনের হাতে পদকটি তুলে দেন তিনি। দেখা যায়, সম্মাননাটি বেগম জিয়াকে দেওয়া হয় ২০১৮ সালে। সাড়ে তিন বছর পর কেন হঠাৎ এ ঘোষণা–এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে দলের মধ্যেই।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলছেন, কানাডীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছিল দলের হাইকমান্ড। তাই সাড়ে তিন বছর ধরে দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পথে হেঁটেছে বিএনপি।

তিনি আরও বলেন, ‘কোন সংগঠন দিল, সেই সংগঠনের অবস্থান কী, সেই সংগঠনটা স্বীকৃত কি না, তার কাজের ব্যাপ্তি কী রকম অর্থাৎ কতটুকু গুরুত্ব আছে। সে ক্ষেত্রে তাকে বলা হলো তুমি কানাডায় ফেরত যাও, গিয়ে এটা আমাদের কনফার্ম কর। একটা অ্যাওয়ার্ড যদি ফেক হয়, তাহলে নেত্রীর জন্য অপমানজনক আর অবমাননা আমাদের জন্য। তখন সেই ছেলে চলে যায়, যাওয়ার পর সম্ভবত দলের থেকে অনুরূপভাবে চিঠি দেওয়া হয় প্রুফ করার জন্য। সাম্প্রতিককালে নয়, কিছুদিন আগে সেটা আসছে।’

এদিকে বেগম জিয়াকে পদক দেওয়া প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিএনপিমনা লোকজনের মধ্যেও। কানাডিয়ান এ সংস্থাটি পরিচালনা করেন স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান মিলে। কলম্বিয়ান বংশোদ্ভূত এ পরিবারটি এর আগে পৃথিবীর কাউকেই এ ধরনের সম্মাননা দেয়নি বলেও তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমের। বিএনপির চেয়ারপারসনের এ ধরনের পুরস্কার গ্রহণ মহাসচিবের ফাজলামো বলেও মন্তব্য তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজনদের।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, সম্মাননা প্রাপ্তির এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি তিনিও জেনেছেন মহাসচিবের সংবাদ সম্মেলনের পর। সাড়ে তিন বছর বিলম্বে ঘোষণার কারণ খোঁজা উচিত বলেও মন্তব্য তার।

সেলিমা রহমান বলেন, ‘অনেক কথাই অনেকে বলতে পারেন, সত্যাটা কী, সেটা আমাদের বের করতে হবে। সেটা তো আমরা জানি না। সত্যটা যখন জানা যাবে, তখন কেন কী দায়-এর কথা আসে। কেন এবং কী–এ দুটো প্রশ্ন তো রয়ে গেছে।’

তবে এ নিয়ে বিতর্ক তোলা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না বলে দাবি তাদের।
এদিকে, কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও)-এর বিষয়ে ঘেঁটে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে একাধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে। তবে যে তিনজন ব্যক্তির নামের ওপর মাউস ক্লিক করলে তাদের ব্যাপারে জানা যায়, তারা তিনজনেই সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী ও কন্যা। এরা কলম্বিয়ান বংশোদ্ভূত। তারা মূলত তাদের দেশের কেউ কানাডা এলে তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকেন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের তেমন কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব ডিরেক্টরসে যাদের তথ্য এই ওয়েবসাইটে রয়েছে তারা হলেন মারিও গুইলম্বো। তার পদবি ফাউন্ডার অ্যান্ড চেয়ার প্রেসিডেন্ট। তার স্ত্রী লিলিয়ানা আনগারিটা। পদবি–ফাউন্ডার অ্যান্ড চেয়ারপারসন, গুডউইল অ্যাম্বাসেডর ও অ্যাম্বাসেডর ফর পিস । অন্যজন তাদের মেয়ে লিলিয়ান জুলিয়েথ গুইলম্বো। তার পদবি ফাউন্ডার চেয়ারপারসন, গুডউইল অ্যাম্বাসেডর ও অ্যাম্বাসেডর ফর পিস।

একইসঙ্গে অন্য যাদের নাম সেখানে রয়েছে, তাদের বিষয়ে কিছু জানার সুযোগ নেই। বাস্তবে এসব নামের মানুষের কোনো অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। তাদের কোনো ছবিও নেই। এদের মধ্যে রয়েছেন ক্লারা ভেলেজ ডি সুলজ, চেয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট, মিশেল রোকা সালভা, চেয়ারপারসন, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনস, গুজউইল অ্যাম্বাসেডর, ফ্রান্সিস ইয়ার্ডলি ওকোয়া মার্টেলো, চেয়ারপারসন, গুডউইল অ্যাম্বাসেডর, অ্যাম্বাসেডর ফর পিস, জিওমারা কোরিয়া, সেক্রেটারি, গুডউইল অ্যাম্বাসেডর এবং মার্সিয়া পেনা পেনা, ট্রেজারার। আর ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব ডিরেক্টরর্সেও স্বামী-স্ত্রী আর কন্যার নাম রয়েছে।

তবে ইয়ুথ হিউম্যান রাইটস প্রোগ্রামে গুইলম্বোর মেয়ে লিলিয়ান জুলিয়েথ গুইলম্বো ছাড়াও আরও দুটি নাম ক্লিক করলে দেখা যায়। তাদের একজনের নাম মেলিসা আমায়া মুনজ। তার পদবি রিসার্চার ইয়ুথ হিউম্যান রাইটস প্রোগ্রাম। সে তার দেশ কলম্বিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বলে জানানো হয়েছে। অন্যজন লুইস মরেনো। তার পদবি স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস আউটরিচ ডিরেক্টর।

সে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর পলিটিক্যাল সায়েন্সের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী বলে লেখা হয়েছে। সে মেক্সিকান বংশোদ্ভূত। এই জায়গায় আরও যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন মারিয়া আলেজান্ড্রা পাডো, এলকিন স্টিভেন ভ্যালেন্সিয়া, মারিয়া ডেলমার টালেরো, জুলিয়ানা গিরালডো, সান্টিয়াগো সেনিন আলবা, নিকোলাস রদ্রিগুয়েজ ব্লানকো, হেরল্ড এডুয়ার্ডো মানটিলা জুনিয়র। এদের সবার পদবি রিসার্চার, ইয়ুথ হিউম্যান রাইটস প্রোগ্রাম। ইন্টারন্যাশনাল মিশন নর্থ আমেরিকার কানাডার আরও দুটি জায়গায় দুজন মহিলার নাম দেখা যায়। ডিরেক্টর, কারমেন রামিরেজ এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হান্না বোখারি।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা গেছে খুবই অগোছাল।

তবে সেখানে মারিও গুইলম্বো এবং তার স্ত্রী ও কন্যা বিভিন্ন সময়ে যে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, সেগুলোর কিছু ছবি রয়েছে এলোমেলোভাবে। পদবির বানানে চেয়ার এবং পারসন দুটো ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সব জায়গায়। যাতে মনে হয়, এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়। তা ছাড়া বোর্ড অব ডিরেক্টর হিসেবে যে নামগুলো দেখা যাচ্ছে, তার দুজন বাদে সবই কলম্বিয়ান নাম মনে হয়। কিন্তু মারিও গুইলম্বোর পড়াশোনা আর উচ্চতর ডিগ্রির ফর্দ অনেক বড়।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন