ইউক্রেনে রাশিয়ার এক দুর্ধর্ষ জেনারেলের গল্প

294
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের পর থেকে ‘নিষ্ঠুর কসাই’ নামে পরিচিত তিনি। এরপর সিরিয়ার আলেপ্পোতে একই ভূমিকা রাখেন। আলেক্সান্ডার ডিভোরনিকভকে নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইহোর রোমানেনকো।

খবর অনুসারে, ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে রুশ বাহিনীর প্রধান হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গ্রোজনিতে রুশ অভিযানের সময় একটি মোটর রাইফেল ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন ডিভোরনিকভ। ১৯৯৯ সালের শেষ দিকে ওই অভিযান শুরু হয়ে শেষ হয় ২০০০ সালের শেষ দিকে।

রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় কার্যত স্বাধীন প্রদেশ চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনি। শহরটিতে বৃষ্টির মতো গোলা ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এরপর একটি ছোট্ট পদাতিক বাহিনী সেখানে ঢুকে যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই গুলি করেছে।

রকেট আর্টিলারি, নিষিদ্ধ গুচ্ছ বোমা ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয় তখন। পুরো গ্রোজনিকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে মাটিতে। ২০০০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শহরটির পতন ঘটে। তখনকার রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন এই হামলায় সমর্থন দেন। মাসখানেক পরেই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মারিউপুলে একই কৌশল ব্যবহার করছে মস্কো। কিয়েভের কর্মকর্তারা মনে করেন, কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে রাশিয়া। শহরের প্রায় প্রতিটি ভবন ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এতে।

আলেপ্পোকে গুঁড়িয়ে দেন তিনি: ২০১৫ সালে পুতিন যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় রুশ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন আলেক্সান্ডার ডিভোরনিকভকে। পতনের মুখে থাকা সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাসার আল-আসাদের প্রশাসনকে বাঁচিয়ে দেন তিনি। তার নেতৃত্ব ও কৌশলে আলেপ্পোসহ বিরোধীদের শক্তঘাঁটিগুলো আসাদ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা—সিরিয়াতেও তিনি গ্রোজনির কৌশল ব্যবহার করেছেন। একটি ঐতিহাসিক শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। যুদ্ধ শেষে ভবনগুলোতে বিস্ফোরণের ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল।

আইহোর রোমানেনকো বলেন, কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারে না। তিনি পুরোনো শোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরবর্তী রুশ পদক্ষেপে আটকে আছেন। তার হাতে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব থাকলে তিনি সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারেন।

কাতারভিত্তিক আল-জাজিরাকে এই সামরিক বিশেষজ্ঞ বলেন, আমরা আলেপ্পোর পরিণতি দেখেছি।

তবে ডিভোরনিকভ এসব দেখেন ভিন্ন চোখে। ২০১৬ সালের মার্চে এক বিরল সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দৈনিক রোসিসকায়া গেজেটকে তিনি বলেন, সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে সিরিয়ার যুদ্ধপরিস্থিতি মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী। খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া থেকে বেঁচে যায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি।

কয়েকদিন আগে তাকে রুশ বীরত্বের পদক দেন পুতিন। ক্রেমলিনের সর্বোচ্চ পুরস্কারগুলোর মধ্যে যা একটি।

ইউক্রেনের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ডিভোরনিকভের এই কৌশল কাজ করবে বলে মনে হচ্ছে না। আইহোর রোমানেনকো বলেন, বনভূমি, ইউক্রেনীয়দের দুঃসাহসী হামলা, রুশ বাহিনীর দুর্বল রসদ ও নাজুক মনোবলের কারণে তারা কিয়েভের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। তারা মারাত্মক ও লজ্জাজনক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন। যে কারণে এপ্রিলের শুরুতে কিয়েভ, চেরনিহিভ ও সুমি অঞ্চল থেকে সেনাপ্রত্যাহার করতে হয়েছে রাশিয়াকে।

কিন্তু ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে বিশাল বৃক্ষহীন তৃণভূমি। কাজেই সেখানে মস্কো একই যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করতে পারে।

বিদ্রোহীদের সমর্থন:
ইউক্রেনের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ দোনেৎসক ও লুহানস্কে বিদ্রোহীরা অস্ত্র তুলে নেওয়ার দুই বছর পর ২০১৬ সালের কথা। তখন রাশিয়ার এই দুর্ধর্ষ জেনারেলকে দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক জেলার দায়িত্ব দেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।

একীভূত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ, জর্জিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অঞ্চল দক্ষিণ ওসেতিয়া ও আবখাজিয়ায় রাশিয়ার ঘাঁটিও রাশিয়ার এই সামরিক জেলার অন্তর্ভুক্ত। এতে কয়েক হাজার যুদ্ধ-পরীক্ষিত সেনাকে যুক্ত করা হয়েছে।

তখন ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর কথা জোরালোভাবে অস্বীকার করে মস্কো। যদিও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পরামর্শ দিতে রাশিয়ার সেনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশ করেছে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

এই যুদ্ধ ছিল ইউরোপের সবচেয়ে উত্তপ্ত সশস্ত্র সংঘাত। এতে তেরো হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে লড়াইয়ের কারণে লাখ লাখ ইউক্রেনীয় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সেই সময়টিতেই রাশিয়ার রোস্তোভ-অন-ডন শহরে আলেক্সান্ডার ডিভোরনিকভ তার নতুন কার্যালয়ে বসেন। দোনবাসে তখন যুদ্ধের সক্রিয় ধাপ প্রায় শেষ হয়ে ট্রেনচ সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এরমধ্যে ইউক্রেন নিয়ে ব্যাপক লেখাপড়া করেন ডিভোরনিকভ এবং অষ্টম গার্ডস কম্বাইন্ড আর্মি গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার রাশিয়ার এই স্থলবাহিনীর পুর্নজন্ম দেন তিনি।

ওয়াশিংটন ডিসির থিংকট্যাংক জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের রাশিয়াভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক পাভেল লুজিন বলেন, ইউক্রেনের দোনবাসে অষ্টম কম্বাইন্ড আর্মির আংশিক মোতায়েন করা হয়েছে। যে কারণে দীর্ঘদিন ধরে পূর্ব ইউক্রেনে সামরিক মঞ্চের সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত হন তিনি।

অ্যাজভ সাগরে ২০১৯ সালের এক ঘটনার মূলনায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। অধিকৃত ক্রিমিয়ার উত্তরপূর্বাঞ্চলের অগভীর সাগরটিতে তখন ইউক্রেনের নৌবাহিনীর জাহাজ প্রবেশ করতে চাইলে রুশ বাহিনী তা জব্দ করে। তখন আটক হওয়া ইউক্রেনের ২৪ নাবিককে প্রায় ১০ মাস রাশিয়ার হাতে বন্দি থাকতে হয়েছে।

ফলে ২০১৯ সালে ডিভোরনিকভসহ রাশিয়ার আরও সাত জেনারেলকে কালোতালিকাভুক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। পশ্চিমা শক্তিগুলোর সাজার মুখে থাকলেও কয়েকটি বড় ও ব্যাপক সামরিক মহড়ার জন্য পুতিন তাদের প্রশংসা করেন।

ইউক্রেন সীমান্তের কাছে ২০২০ সালের বিপুল ককেসাস সামরিক মহড়ার নেতৃত্ব দেন তিনি। রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোর হাজার হাজার সেনা এই মহড়ায় অংশ নেন। আর্মেনিয়া, অধিকৃত ক্রিমিয়াসহ রাশিয়ার ৩০টি অঞ্চলে মহড়াটি হয়েছে।

এ সময়ে মোবাইল এশালন কিংবা ভ্রাম্যমাণ সামরিক বিন্যাসের ব্যবহার আয়ত্ত করেন তারা। স্থল, সাগর ও আকাশপথে সামরিক বাহিনীর বিন্যাসের নতুন উপায় হচ্ছে মোবাইল এশালন।

সেই মহড়া শেষাংশ দেখতে কাপুস্টিন ইয়ার শহরের ভোলগা অঞ্চলে অনেকটা জাঁকজমকের সঙ্গে পরিদর্শনে যান ভ্লাদিমির পুতিন। রুশ প্রেসিডেন্টকে আলেক্সান্ডার ডিভোরনিকভ বলেন, সামরিক বাহিনীর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

তখন ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, ইউক্রেনে অভিযান চালাতে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর একটি অংশকে প্রস্তুত করতে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।

২০২১ সালের মার্চ ও এপ্রিলে শক্তি প্রদর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় আলেক্সান্ডার ডিভোরনিকভের সামরিক জেলা। মস্কোবান্ধব বেলারুশ ও অধিকৃত ক্রিমিয়া সীমান্তে এক লাখ সেনা জড়ো করে ক্রেমলিন। এই শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে প্রথম মুখোমুখি বৈঠকে বসেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

কিন্তু ন্যাটোর সদস্য হতে কিয়েভের অভিলাষ ও পূর্ব ইউক্রেনে পশ্চিমা সামরিক জোটটির উপস্থিতি সীমিত করে আনতে রাশিয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন। এরপর ইউক্রেনকে ‘নতুন-নাৎসি’ মুক্ত করতে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানের মতে, ইউক্রেনের সামরিক অভিযান পরিচালনায় প্রথম দিকে কোনো জেনারেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। পরে সোমবার আলেক্সান্ডার ডিভোরনিকভকে সেই দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার বলছে, ইতিমধ্যে দোনবাস ও দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে অভিযান চালিয়েছেন ডিভোরনিকভ। সেখানের একটি বড় শহর কেন্দ্র খেরসন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।

ইউক্রেন যুদ্ধের নাজুক অবস্থা থেকে মুক্ত হতেই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থলবাহিনীর ব্যবস্থাপনাকে আরও কেন্দ্রীভূত করতে চাচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

বিশ্লেষক লুজিন বলেন, অঞ্চলটিতে সবচেয়ে অগ্রসর জেনারেল আলেক্সান্ডার ডিভোরনিকভ। পূর্ব ইউক্রেনে নতুন অভিযান চালাতে মারাত্মক সমস্যাগুলো দূর করতেই তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

যদিও এমন অনুমানকে নাকচ করে দিয়েছেন অন্যরা। জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রুশ গবেষক নোকোলাই মিত্রোখিন বলেন, এই জেনারেল তার ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ শান্তির সময়ে দূরবর্তী সামরিক ইউনিট ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া বড় কোনো যুদ্ধে জড়িত নেই।

তিনি বলেন, তার নিয়োগে ইউক্রেন যুদ্ধে কোনো বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছি না।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন