মানুষ মেরেও টনক নড়েনি, ডিএনসিসিতে অর্ধশত চালক নিয়োগে অনিয়ম

493
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

মানা হয়নি চাকরি শর্ত অনেকেরই নেই যোগ্যতা তবুও একযোগে নিয়োগ পেয়েছেন ৪৬ জন। ময়লার গাড়ির ধাক্কায়, একের পর এক প্রাণহানিতেও টনক নড়েনি সিটি করপোরেশনের। উল্টো নতুন করে চালক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের অনুসন্ধানে।

২৫ নভেম্বর ২০২১ রাজধানীর পান্থপথ এলাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় মারা যান সাংবাদিক আহসান কবির খান। এর মাস খানেক পরেই মহাখালীতে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় মারা যান খোঁদ সিটি করপোরেশনেরই এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

এমন শুধু দুয়েকটি ঘটনা নয় গত ছয় মাসে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির নিচে আহত বা নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। এসব ঘটনায় প্রায় সবগুলোতেই দেখা গেছে যারা গাড়ি চালাচ্ছিলেন তাদের বেশিরভাগই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এগুলোর বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছে সিটি করপোরেশন?

১৮ মে ২০২২। রাজধানীর খিলগাঁও ডাম্পিং স্টেজ। একযোগে উত্তর সিটির তিনটি গাড়ি রাস্তায় নেমেছে ময়লা অপসারণে। তাদেরই একজন মো. পলাশ। পদে সুইপার কিন্তু চালাচ্ছেন এই গাড়ি।

তাহলে তিনি কিভাবে গাড়ি চালাচ্ছে? প্রশ্ন করা হলে পলাশ বলেন, এটা দক্ষ ক্লিনার দেখিয়ে চালাচ্ছি।

উত্তর সিটিতে তার মতো এমন প্রায় প্রতিটি ময়লার গাড়িই চালাচ্ছেন সুইপার কিংবা ক্লিনাররা।

এদেরই একজন বলেন, তিনি ক্লিনার পদে চাকরি করছেন। তাহলে গাড়ি চালাচ্ছেন কিভাবে? উত্তর, স্যাররা দিয়েছে দয়ামায়া করে গরীব মানুষ করে খাওয়ার জন্য।

নানা সমালোচনার পর গত ডিসেম্বরে চালক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় উত্তর সিটি। ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে শুধু ভারি লাইসেন্সধারীদের চাকরির যোগ্য বলে শর্ত দেয়া হয়। সব প্রক্রিয়া শেষ না করেই গত ২০ এপ্রিল নিয়োগ দেয়া হয় ৪৬ জনকে। চারদিনের মাথায়ই চাকরিতে যোগ দেন তারা।

নিয়োগ প্রাপ্তদের তালিকায় প্রথমেই নাম দিদার মো. হেলালের। চাকরির আবেদনে জন্ম তারিখ দেখিয়েছেন ১৫ মে ১৯৯৪, সে অনুযায়ী বর্তমান বয়স ২৮। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র বলছে তার বর্তমান বয়স ৩৪। তালিকার দ্বিতীয় নাম মাসুদ রানার। তিনি ৭ বছর বয়স চুরি করেছেন। অনুসন্ধান বলছে এমন অনেকেই চাকরি নিয়েছেন ভূয়া তথ্য দিয়ে।

অনুসন্ধানে এবারের গন্তব্য মিরপুরের বিআরটিএ কার্যালয়ে। শুধু বয়স নয় হালকা যানের লাইসেন্স নিয়েই অনেকেই নিয়োগ পেয়েছেন ভারি চালক হিসেবে।

ঢাকা মেট্রো সার্কেল বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক দেবাশীস বিশ্বাস বলেন, এটা নেয়া যায় না। কিন্তু এরকম যদি হয়ে থাকে তাহলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।

এত দুর্ঘটনার পরও ভূয়া তথ্য দিয়ে কিভাবে এত সহজেই মিলছে এসব চাকরি। জানতে উত্তর সিটির করপোরেশন কার্যালয়ে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সিইও সেলিম রেজা বলেন, লাইসেন্সবিহীন, অসঙ্গতি পূর্ণ কোনও ড্রাইভার কোনও অবস্থাতেই এখানে নিয়োগ পাবে না। সেই বিষয়টা নিশ্চিত হওয়ার পরই এই নিয়োগ কনফার্ম করা হবে। যারা যোগদান করেছে তারা তো কাজ করবে না আর। এইগুলো এখন প্রক্রিয়াধীন আছে তাদের জয়েন্ট করিয়ে রেখেছি।

সিটি করপোরেশনের এমন দাবির সত্যতা যাচাইয়ে আবারও মাঠে নামে চ্যানেল 24। ২০ মে রাত সাড়ে ১১টা। রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভারেই পাওয়া গেলো সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত সেই মাসুদ রানাকে। এই ছবিই বলছে, সিটি করপোরেশনের দাবি সত্য নয়।

মাসুদ রানা মতো নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় অর্ধেক চালকই গাড়ি নিয়ে নেমে পড়েছেন রাতের আধারে। তাহলে নির্বাহী কর্মকর্তার কথার ভিত্তি কোথায়? এসব নিয়োগের নানা অনিয়মের প্রমাণ তুলে ধরতেই আসল সত্যটা এবার প্রকাশ করলেন এই কর্মকর্তা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সিইও সেলিম রেজা বলেন, মামলার ভয়ে তাড়াহুড়া করে তাদের নিয়োগটা দিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা হয়ে গেলে আমরা হেভি লাইসেন্সের ড্রাইভার আর পাবো না। একদম চলে যাবে।

চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর গত ফেব্রুয়ারিতে একটি রুলের বিপরীতে ১৯টি পদ সংরক্ষণ করে নিয়োগের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পরে সিটি করপোরেশন হাইকোর্টের সে আদেশ স্থগিত করিয়ে তড়িঘড়ি করে একটি পদ ব্যতিত নিয়োগ দেয়া হয় ৪৬টি পদে।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন