চীনকে হাতে রাখলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি কী

193
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

বিশ্ব অর্থনীতির ময়দানে বাঘা খেলোয়াড় চীন। দেশটির সম্পদ জিডিপির প্রায় ৪৭০ শতাংশ। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। এর মোট জাতীয় সঞ্চয় জিডিপির প্রায় ৪৫ শতাংশ। চীন বিশ্বের বৃহত্তম ঋণদাতা। বিশ্ব অর্থনীতিতে এত অর্জন শক্তিশালী করেছে চীনকে। সেই চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বিভক্তি। চীনের বিস্তার ও বিচরণ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে নানা আয়োজন। মিত্রদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জোটে থেকে এবং নতুন জোট গঠন করে চীনবিরোধী নানা উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে চীনও তার সহযোগীদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাধা মোকাবিলায় ব্যতিব্যস্ত।

গত এপ্রিলে আটলান্টিক কাউন্সিলের সভায় মার্কিন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিভক্তি কাম্য নয়। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত চীনের সঙ্গে কাজ করা।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে ইয়েলেনের যুক্তি হলো— চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিজ্ঞ। বিশ্ব অর্থনীতিতে কীভাবে কাজ করা যায়— সে বিষয়ে চীনের জানাশোনা ভালো আছে। এ ছাড়া বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মও মেনে চলে চীন।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা শুধু তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, যারা বিশ্বকে তাদের চোখে দেখে। বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো টিকে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সবার সঙ্গে কাজ করতে হবে। যদি চীনকে তারা ‘বিচ্ছিন্ন’ করতে চায়, তাহলে চীনও আগ্রাসী হবে। বরং অর্থনীতিতে শক্তিশালী এ দুটি দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে উভয়রই লাভ রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব : চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী পদক্ষেপের সমালোচনা করে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো একরাষ্ট্র কেন্দ্রীক আধিপত্য করার সমর্থন পাবে না। প্রতিটি দেশ একে অপরের সঙ্গে ন্যায্য প্রতিযোগিতা করতে পারে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও কিছু প্রতিযোগিতা রয়েছে। তবে এটি কোনোভাবেই ধ্বংসাত্মক হওয়া উচিত নয়। আমরা কখনো জবরদস্তির কাছে নত হব না এবং কঠিনভাবে চীনের সার্বভৌমত্ব, সুরক্ষা ও উন্নয়নের স্বার্থ রক্ষা করব।

কোয়াড জোট: ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে প্রতিহত করতে কোয়াড জোট গঠন করে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সামুদ্রিক নজরদারি পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোয়াডের এই পদক্ষেপ চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনকে মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার জোটের নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এটি। এরইমধ্যে চীনের প্রভাব ঠেকাতে পাঁচ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোয়াড। এ ছাড়া চলতি মাসে চীনকে মোকাবিলায় ১৩টি দেশ নিয়ে ‘ইন্দো–প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে নতুন একটি বাণিজ্য উদ্যোগের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

তাইওয়ানে হস্তক্ষেপ: প্রতিবেশী তাইওয়ানকে অবিচ্ছেদ্য অংশ দাবি করে চীন। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মনে করে। চীনের প্রভাব থেকে রেহাই পেতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে তাইওয়ানের। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা পেয়ে থাকে তাইওয়ান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাইওয়ানে একের পর এক সামরিক মহড়া পরিচালনা করে চীন।

সবশেষ যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাইওয়ানে সামরিক হামলা চালালে চীনের বিরুদ্ধেও সামরিক পদক্ষেপ নেবে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে চীন জানিয়েছে, এটি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এতে কারো নাক গলানোর প্রয়োজন নেই।

চীন-সলোমন চুক্তি: প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সলোমন দ্বীপপুঞ্জের পুরোনো মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। গত এপ্রিলে সেই যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে চীন—সলোমন একটি সহযোগিতা চুক্তি সই করে। সলোমন দ্বীপপুঞ্জের নিরাপত্তা, আর্থিক ও মানবিক সহযোগিতাস্বরূপ এই চুক্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে ওশেনিয়া মহাদেশের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটিতে সামরিক ঘাঁটি গড়ার সুযোগ পাবে চীন। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে দ্বীপ দেশটিতে দূতাবাস খোলার কথা জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

পশ্চিমা রুশ নিষেধাজ্ঞা: ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চীন আপত্তি ও উদ্বেগ জানিয়েছে। এমনকী ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযানে চীন পশ্চিমাদের সুরে নিন্দা জানায়নি। রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও রুশ অভিযানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে। তবে যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে চীন।

এশিয়া টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, রাশিয়া সম্পর্কিত চীনের কোনো নীতি যুক্তরাষ্ট্র বদলাতে পারবে না। কোনো চাপে পড়েও রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেবে না চীন। রাশিয়াকে শায়েস্তার জন্য চীন কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবে না। কারণ চীন-রাশিয়া যৌথ মার্কিনবিরোধী, এই দৃষ্টিকোণ থেকেই তাদের বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

চীনের অর্থনীতি ও উন্নয়ন ভাবনা: আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোয় দায়িত্বশীল অংশীদার চীন। পশ্চিমাদের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরেও চীনের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশটি সম্প্রতি দুটি আঞ্চলিক বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক তৈরি করেছে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) আন্তর্জাতিক আর্থিক নির্মাণের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প হিসেবে চীনের এসব প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট অবদান রাখবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) নীতি নির্ধারণী বিষয়ে চীনের ভোটিং শেয়ার ৬ দশমিক ১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকে এই দুই দেশের শেয়ার যথাক্রমে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। চীনের বিশাল অর্থনীতির কাছে যা সংগতিপূর্ণ নয়। আমেরিকার বাধার কারণে চীনের এ ভোটিং শেয়ার বাড়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। এ কারণে চীন নতুন নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরির যৌক্তিকতাও রাখে। ফলে বৈশ্বিক আর্থিক বেষ্টনী বিভক্তির সঞ্চার হচ্ছে। যা কৌশলগত কারণে অন্য দেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।

চীনের ঋণ ব্যবস্থাপনা: যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কলেজ অব উইলিয়াম অ্যান্ড মেরির একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা— এইডড্যাটার তথ্য অনুসারে, পৃথিবীর ১৬৫ দেশের মধ্যে চীনাদের ৮৪৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১৩ হাজার ৪২৭টি চীনা উন্নয়ন প্রকল্প কাজ করছে।

এইডড্যাটার মতে, চীনা ঋণের একটি বড় অংশই প্রকাশ করা হয় না কিংবা পরিসংখ্যানে আসে না। পৃথিবীতে ৪০টি নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশকে তাদের জিডিপির ১০ শতাংশ ‘হিডেন ডেট’ হিসেবে ঋণ দিয়েছে চীন।

এ ছাড়া জিবুতি, জাম্বিয়া, রিপাবলিক অব কঙ্গো, নাইজার, লাওস, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনেগ্রো, কিরগিজিস্তানের মতো দেশে তাদের জিডিপির ২৫ শতাংশের সমপরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে।

ঋণের বেশির ভাগই প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) তহবিল থেকে সড়ক, রেলওয়ে, বন্দর, খনিজসম্পদ উত্তোলন শিল্পে দেয়া হয়েছে।

জি-৭ ও চীন: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল স্বীকৃত যুক্তরাষ্ট্রসহ সাতটি উন্নত অর্থনীতির দেশ নিয়ে গঠিত জি-৭। এই গ্রুপের আওতায় নেই চীন। চীনা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও প্রণোদনার সঙ্গে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। এটিই পশ্চিম ও চীন উত্তেজনার একটি প্রধান কারণ। মার্কিন অর্থমন্ত্রী ইয়েলেনের মতে, এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র সমমনা দেশগুলোকে নিয়ে জোটভুক্ত হয়। এটিই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহজ। কারণ পরস্পরের বিরোধপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, স্বার্থ, মতাদর্শ ও অবস্থান আপসের জায়গায় নিয়ে আসা সহজ নয়। জি-৭ দেশগুলোর সঙ্গে ইউক্রেন ইস্যুতে চীন আলাদা অবস্থান নিয়েছে। এ কারণে চীনের প্রতি অসহিষ্ণুতা দেখানো ও চীনকে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া ঠিক হবে না।

ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কুইন মেরি গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অধ্যাপক পাওলা সুবাচ্চির মতে, জি-৭ দেশগুলোর উচিত চীন ও তাদের অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা। পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি ও মতানৈক্যের ঝুঁকি কম রয়েছে— এমন জায়গাগুলোতে জোর দেওয়া এবং সহযোগিতার কোনো সুযোগ থাকলে তা করা উচিত।

চীনের বাস্তবিক জ্ঞান ও অভিন্ন পশ্চিমা লক্ষ্য: গত এপ্রিলে জি-২০ দেশগুলোর কমন ফ্রেমওয়ার্ক ঋণ-পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় সহযোগিতা দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। এটি ভালো লক্ষণ। এমনকি রাশিয়ার যুদ্ধ ইস্যুতেও ভিন্ন কারণে পশ্চিমা ও চীনা অবস্থানের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। মার্চের শুরুতে আর্থিক ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে রাশিয়া ও বেলারুশের সঙ্গে সব ব্যবসা স্থগিত করে এআইআইবি। এ ছাড়া এনডিবি রাশিয়ায় নতুন লেনদেন আটকে রেখেছে বলে জানায় চীন। এটি প্রমাণ করে, লক্ষ্য অর্জনে অভিন্ন আদর্শ ও মূল্যবোধ একমাত্র উপায় নয়; বাস্তবিক বিবেচনাও অতি গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন