দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি বিএনপি?

180
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপির জন্ম সেনাছাউনিতে। প্রায় পনেরো বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে এই দলটি। দলীয় কার্যালয়ে ও জাতীয় প্রেসক্লাবে হাঁকডাক থাকলেও রাজনৈতিক কলাকৌশলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপি হেরে যাচ্ছে বারবার। এরই মধ্যে আরেকটি জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসছে। কিন্তু বিএনপি এখনো তাদের নির্বাচনী কৌশল ঠিক করতে পারছে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, বিএনপি এখনো হাঁটছে অনিশ্চিত পথে।

রাজনীতি হলো বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের খেলা। এতে টিকে থাকতে হলে সময়োপযোগী হতে হয়, সক্ষমতা ও সাহসের প্রমাণ দিতে হয়। থাকতে হয় প্রবল আত্মসমালোচনা। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল বিএনপি গেল এক যুগের বেশি সময়ে এসবের কোনোটিই করে দেখাতে পারেনি। দলটির রাজনৈতিক সক্ষমতা তলানিতে। সেখান থেকে উঠে আসতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

গেল ২২ জুন সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশ্ন রাখেন: বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কাকে সরকারপ্রধান করা হবে? আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ দলের জন্মস্থান কোথায়?

বিএনপির প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন স্বৈরশাসক। যিনি খুনি মোশতাকের সঙ্গে হাত মেলান। জাতির পিতার হত্যার সঙ্গে জড়িত। তিনি আইয়ুব খানের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তিনি কারফিউ গণতন্ত্র দিয়েছেন। তার হাতে তৈরি দল বিএনপি। তৃণমূল থেকে উঠে না-আসা এমন একটি দলের কাছে কী আশা করা যায়?

২৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি যদি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেয়, তাতেও বাধা দেয়া হবে না। বাংলামোটরে যে বাধা দেয়া, সেটা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছি। আসুক না হেঁটে হেঁটে যত দূর আসতে পারে। কোনো আপত্তি নেই। আমি বসাব, চা খাওয়াব। কথা বলতে চাইলে শুনব।’

পরদিন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘তার আগে বলে দেন যে কেয়ারটেকার সিস্টেম মেনে নিচ্ছি, সেটা বলে দেন। তারপর চা-টা খাওয়ালে অসুবিধা নেই। আমি গতকালও বলেছি, এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক পার্লামেন্ট, জবাবদিহিমূলক সরকার। এই সরকারের তো কোনো জবাবদিহিতা নেই।’

তিনি বলেন, ‘নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন, যেন সত্যিকার অর্থে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।’

কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো কর্মসূচি দেয়ার মতো অবস্থায় বিএনপি এখন আর নেই। মাঠপর্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিক তৎপরতা দৃশ্যমান নেই। আগামী ১ সেপ্টেম্বর দলটি ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করবে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তখনকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পথের অনুসারীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন দলটি।

এত বছর পরও বিএনপিতে বহু মতের সম্মিলন ঘটেনি। দলীয় ঐক্য ও অভ্যন্তরীণ সংহতিও প্রশ্নের মুখে। শীর্ষ নেতৃত্বে মতের অমিল, পারস্পরিক সন্দেহ ও দ্বন্দ্বে সাংগঠনিকভাবে নাজুক অবস্থায় বিএনপি। এতে মাঠে নেমে কাঙ্ক্ষিত ফল প্রত্যাশা করা যায় না।

তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির কমিটি নেই। কিন্তু দলীয় অন্তর্কোন্দল ঠিকই আছে। দলটি একধরনের স্থবিরতার মধ্যে চলছে। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, সারা দেশে বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা না-থাকলেও বিরোধ ঠিকই আছে। এর সমাধানে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের তেমন গরজ আছে বলে মনে হচ্ছে না।

বলা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দলটির ঐক্য সংহত না-থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের সমস্যা নিরসনে পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এমনকি ভোলায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বিএনপির দুই নেতাকর্মী নিহত হওয়ার পরও দলটি কোনো কঠোর কর্মসূচিতে যাচ্ছে না; বরং তারা শোক ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই তারা পিছু হটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অনেকে জানতে চান কবে কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। তাদের কথা শুনে আমি অবাক হই। বিএনপি তো আন্দোলনের মধ্যেই আছে। সরকারের নানা ব্যর্থতায় আমরা রাজপথেই প্রতিবাদ করছি। আন্দোলন মানে তো গাড়ি ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও নয়, আমরা এসবে বিশ্বাস করি না। জনগণও সেটা চায় না। আমরা চাই সরকারবিরোধী একটি গণআন্দোলন। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। বৃহত্তর ঐক্য তৈরিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করছি। গণঅভ্যুত্থান ছাড়া এ সরকারকে হটানো সম্ভব হবে না।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি সবসময় গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী। কিন্তু সরকার তার গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে সবসময় বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করে। অতীতে আমরা সরকারের এমন নীলনকশা দেখেছি। সরকার একটা বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করে বিএনপিকে আন্দোলনে উসকে দিতে চাইছে। কিন্তু আমরা সরকারের কোনো উসকানিতে পা দেব না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সময়মতো চূড়ান্ত আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

নির্বাচনের দেড় বছর বাকি থাকলেও সংঘাতের ভয়ে বড় কর্মসূচি দেয়া থেকে বিরত থাকছে বিএনপি। নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রেখে নির্বাচনের কাছাকাছি গিয়ে বড় আন্দোলন গড়তে চায় বলে দলটির নেতারা আভাস দিয়েছেন। কিন্তু বিএনপির যে নেতৃত্বের কাঠামো, তাতে তা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিএনপির তৎপরতা দেখে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, দলটি কী তবে মুসলিম লীগের মতো হয়ে যাচ্ছে? জানা কথা, মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির স্বার্থবিরোধী অবস্থান নেয়ায় গ্রহণযোগ্যতা হারায় দলটি। আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। মুসলিম লীগ নামে রাজনৈতিক দল থাকলেও তা কেবল সাইনবোর্ডসর্বস্ব।

দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে বছর দুয়েক কারাগারে ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমানে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রয়েছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছেন না। আর দলটির দণ্ডিত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে পলাতক। অনলাইনের মাধ্যমে দল চালান তিনি। ফলে সরকার পতনে দলটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

জানা গেছে, ভোলায় সংঘর্ষের পরই দলের নীতিনির্ধারকরা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। পুরো পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ করেন তারা। বৈঠকে প্রায় সব নেতাই একমত হন–এ ঘটনার পেছনে সরকারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। তারা মনে করেন, এর পেছনে সরকারের মূলত দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত, যেকোনোভাবে এ মুহূর্তে বিএনপিকে রাজপথে নামাতে চায় সরকার। এমন বার্তা তাদের কাছে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজপথে নামলে সরকার কতটা কঠিন হতে পারে–বিরোধী দলগুলোকে এমন বার্তা দেয়া।

রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার অভাব

বৃহত্তর ঐক্য গড়তে এরই মধ্যে বিভিন্ন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছে বিএনপি। বিভিন্ন দলের সঙ্গে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে তারা ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ গড়তে চায় বলে জানা গেছে।

নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে তারা বৈঠক করেছে। অথচ এসব দলের কোনো গণভিত্তি নেই। দলগুলোর এমন কোনো কর্মসূচি নেই, যা দেখে তাদের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপির রাজনীতি কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক। যে করেই হোক তারা মসনদ দখল করতে চায়। এমনকি সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া নিয়ে তারা কোনো বড় কর্মসূচিতে যাওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

বিএনপি মনে করে, জাতীয় নির্বাচনের দেড় বছর বাকি থাকতে এখনই যদি মাঠে নামে, তাহলে ফল নিয়ে ঘরে ফেরা কঠিন হয়ে যাবে। এ বিষয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সরকার নানাভাবে বিএনপি ও নেতাকর্মীদের উসকানি দিচ্ছে। নির্যাতন করছে। গুলি চালিয়ে হত্যা করছে। কিন্তু এরপরও তারা সরকারের ফাঁদে পা দেবে না। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালিয়ে জনগণকে আরও সম্পৃক্ত করা হবে। এর ধারাবাহিকতায় তারা কঠোর আন্দোলনে যাবে।

ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখেই নির্বাচন করে বিএনপি। কিন্তু আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে তারা টিকতে পারেনি। আওয়ামী লীগ পারলেও তার আঠারো বছর পর ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। অর্থাৎ ২০১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে আওয়ামী লীগকে বাধ্য করতে পারেনি বিএনপি। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই তারা নির্বাচনে অংশ নেয়। যথারীতি নির্বাচনে তাদের ভরাডুবিও হয়।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে না গিয়ে ভুল করেছিল বিএনপি। কারণ, এতে মাঠ আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। কিন্তু ড. কামাল হোসেন ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের পরামর্শে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাদের অংশ নেয়া ছিল আরেক ভুল। কারণ, ‘প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন’ ছাড়া আওয়ামী লীগের ওপর তারা কোনো দায় চাপাতে পারেনি। তারা যেমন নির্বাচনী মাঠে ঢুকতে পারেনি, তেমনি রাজপথেও ছিল না তাদের কোনো প্রতিরোধ।

অর্থাৎ, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির কোনো কৌশল ছিল না। বহিরাগতদের পরামর্শে দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দলটিকে নির্বাচনে মাঠে নামতে হয়েছে। আর তার ফল এসেছে লজ্জাজনক পরাজয় হিসেবে। গেল এক দশকে আওয়ামী লীগের দৃঢ়তার কাছে মাঠে দাঁড়াতে পারেনি বিএনপি। গণবিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি জনসমর্থনেরও ভাটা চলছে দলটির।

নেই নির্বাচনী কৌশল

বিএনপিতে অনেক বড় বড় নেতা থাকলেও তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। নির্বাচন নিয়ে তারা সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়নে ব্যর্থ। একাদশ নির্বাচনে তাদের গণফোরামের মতো একটি সাইবোর্ডসর্বস্ব দলের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। তখন বিএনপির নির্বাচনী কৌশলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. কামাল হোসেন। অথচ আওয়ামী লীগ, সিপিবি ও ন্যাপের (মোজাফফর) কয়েকজন দলছুটের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় গণফোরাম। এর কারণ হচ্ছে, বিএনপির এককভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার সক্ষমতা নেই। তাদের কোনো সর্বজনীন মতাদর্শও নেই। যে কারণে সামাজিকমাধ্যমে আন্দোলন, সরকার পতন, বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা যতটা কল্পনাবিলাসী, মাঠের লড়াইয়ে তাদের ততটা অবস্থান নেই।

বলা যায়, রাজনৈতিক মাঠে বিএনপি অনেকটা একা। সহযোগী আছে কিছু ছোট ও নামসর্বস্ব দল। এমনকি এর আগের নির্বাচনগুলোতে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নির্বাচনী বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা প্রকাশ্যে সেই অভিযোগ করেছেন।

ক্ষমতার কেন্দ্রে জন্ম নিয়েছে বিএনপি। এতে দলটির নেতাকর্মীরাও ক্ষমতার আশপাশে থাকতে পছন্দ করেন। যে কারণে দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়া জেলে গেলে তাকে মুক্তির জন্য জোরালো কোনো আন্দোলন করতে পারেনি বিএনপি। বরং সরকারপ্রধানের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর তাদের ভরসা রাখতে হয়েছে। আগে কোনো রাজনৈতিক দলকে তাদের নেতাদের মুক্তির জন্য এমন নতজানু হতে দেখা যায়নি। আবার অস্তিত্ব ধরে রাখতে দলীয় প্রধানকে কারাগারে রেখেই তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হয়েছে।

দূরদৃষ্টির অভাব ও নির্বাচন বর্জন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপিকে সবসময় অদূরদর্শী বলা হয়। যে কারণে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এজন্য তাদের পস্তাতেও হয়েছে। গত বছরের ৪ মার্চ চট্টগ্রামে এক মতবিনিময়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সরকারের আমলে আগের দু-একটি নির্বাচন বর্জন সঠিক হয়নি। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলকে জনগণের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে চায়।

দলটি যে ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তা বুঝতে পারেন বিএনপির মহাসচিব। তাদের নির্বাচন বর্জনের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের সময় নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। পরে অবশ্য ১৯৮৮ সালে বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ বিরোধী জোট নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচন বয়কট করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। এতে তারা রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যায়।

কিন্তু ২০১৪ সালে নির্বাচন বয়কট করে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে বিএনপিকে। পরবর্তী সময়ে তা বুঝতে পেরেছেন মির্জা ফখরুল। যে কারণে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি।’ তারা তখন নির্বাচনেও অংশ নেয়নি, রাজপথেও সামর্থ্য দেখাতে পারেনি।

২০১৩ সাল থেকে পরবর্তী দুই বছরে নির্বাচন বর্জন ও বাতিলের দাবিতে বিএনপির রাজনীতির যে প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে, তাতে বিএনপি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত নির্বাচন বয়কট এবং নির্বাচন বাতিলের দাবিতে বিএনপি যে রাজনীতি শুরু করে এবং সে রাজনীতি মোকাবিলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার পরিণতি আজকের নতজানু বিএনপি। সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়, সম্ভাবনাও হারিয়ে ফেলে। যার শক্তি নেই, সম্ভাবনা নেই—রাজনীতিতে তার গুরুত্ব কী?

পরিবারতন্ত্রে বিপাকে বিএনপি

বিএনপির রাজনীতির বড় একটি ক্ষত হচ্ছে পরিবারতন্ত্র। দলে গঠনতন্ত্র মানলেও ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু কোনোভাবে পরিবারতন্ত্রের দাপট থাকলে তার উল্টোও ঘটে। আগে বিএনপি চলত খালেদা জিয়ার একক সিদ্ধান্তে; কিন্তু দুর্নীতির দায়ে তার কারাগারে যাওয়া, সেখান থেকে মানবিক কারণে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। এতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে দেখা গেছে বিএনপিকে।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতার আসনে আছেন তারেক রহমান। কিন্তু দলে তার নেতৃত্ব শক্ত হতে সময় লেগেছে। তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্ত ও কর্তৃত্ব নিয়ে দলের মধ্যে আপত্তির কথা শোনা গেছে। এমনকি বিদেশি একাধিক মহলেও তাকে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে আলোচনা আছে। দেশি-বিদেশি মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি তারেক রহমান। ক্ষমতার রাজনীতির জন্য যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা রয়েছে।

তারেক রহমান লন্ডনে থাকায় দল পরিচালনায় ‘লোকাল কমান্ড’ ঠিক করার প্রস্তাবও উঠেছিল। সংবাদমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে যে, দলের পুরোনো ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে তারেকের অপছন্দ। কারণ, তাদের নিজের লোক মনে করেন না তিনি।

দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুলের এক মন্তব্যে সেই প্রশ্নটি উঠে এসেছে। একটি জাতীয় দৈনিককে তিনি বলেছিলেন, ‘যারা বেগম জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন বা তারও আগে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে থেকে রাজনীতি করেছেন, স্বাভাবিকভাবেই প্রথম দিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বটাকে চট করে মেনে নিতে তাদের হয়তো একটু দ্বিধা হয়েছে। এখন নেতৃত্ব নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই। বরং এখন আমরা দলে একটা যৌথ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি।’

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন দেয়া নিয়ে ক্ষোভ ছিল। সেই রেশে দল ছাড়েন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান। অনেক অনুরোধের পরও চট্টগ্রাম-৮ আসনের মনোনয়ন দেয়া হয়নি তাকে। সেখানে মনোনয়ন পান চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান। প্রায় অর্ধশত আসনে মনোনয়ন পরিবর্তন করা হয়। তারেক রহমান এসব এককভাবে করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে বসা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হয় তারেকের সিদ্ধান্তে। এমনকি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনেও তার সম্মতি ছিল। নতুন-পুরোনোদের এক করে দলকে সংগঠিত করা দরকার থাকলেও তা হয়নি। বিপরীতে তারেকের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি বেড়েছে। তারা হতাশা প্রকাশ করেন।

গেল বছরের জুনে গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, অযৌক্তিক ধারণা নিয়ে বসে আছে বিএনপি। মাঠে-কৌশলে, দুটোর কোনোটিতেই নেই তারা। তাদের মগজ স্থবির হয়ে আছে। এরা কোনো চেষ্টাই করছে না। তারেক রহমান মনে করেন, কেউ-না-কেউ তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে।

নেতৃত্বের সংকটে বিএনপি

খালেদা জিয়া অসুস্থ, তারেক রহমান লন্ডনে পলাতক, বিকল্প মুখও নেই বিএনপির সামনে। অথচ আগামী বছরের শেষ দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জিয়া পরিবার থেকে নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব ছিল না। দ্বাদশেও তার ব্যত্যয় ঘটছে না। প্রশ্ন হলো: নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী জোটের নেতৃত্ব কে দেবে? আবার ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বের পথেও যাচ্ছে না বিএনপি। সব মিলিয়ে বিরোধী দলটির নেতাকর্মীরা এক ধরনের অন্ধকারেই আছেন।

গেল বছর ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন অনুসারে, বিএনপিতে ‘বিশৃঙ্খলা ও দেউলিয়াত্ব’ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে। তখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জোটের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব পড়ে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যাওয়া ড. কামাল হোসেনের ওপর। এই নির্ভরশীলতাই বলে দিয়েছে দলটি কতটা নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগছে ও রাজনৈতিক দৈন্যদশার মধ্যে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে দলটিতে অরাজকতা চলছে।

দুর্নীতিতে জড়িত শীর্ষ নেতারা

এতিমদের টাকা আত্মসাতের দায়ে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর দলে নিজের আস্থা ধরে রাখতে পারেননি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনায় সহযোগিতা ও শেখ হাসিনাকে গুপ্তহত্যার চেষ্টার দায়ে তারেক রহমানকে সাজা দিয়েছেন আদালত।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক গোপন তারবার্তায় তারেক রহমান সম্পর্কে লেখেন, তারেক রহমান ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতির জন্য দায়ী, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলছে…।

এ ছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নাইকো, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া দুর্নীতির মামলা রয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল বাংলাদেশ। আর এ সময়ে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি।

তারেক রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ ও মানি লন্ডারিং নিয়ে তদন্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। বাংলাদেশের আদালতে তাদের বিরুদ্ধে এসে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন এফবিআইয়ের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি।

মাঠের সক্ষমতা না বুঝেই হরতাল

গেল এক যুগে নিজের মাঠের যোগ্যতা পর্যালোচনা না-করেই বিভিন্ন সময় হরতাল ডেকেছে বিএনপি। এরপর দলটির নেতারা যেমন ঘরে বসে ছিলেন, কর্মীরাও রাস্তায় নেমে আসেনি। কখনো-কখনো রাজধানীর অলিগলিতে সাত-আটজন মিছিল নিয়ে নেমেছে। কয়েক মুহূর্তে তা আবার উধাও হয়ে গেছে। হরতাল ডাকার পর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতি দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, হরতাল ডেকে ঘরে বসেছিলেন বিএনপি নেতারা।

তবে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে গাড়িতে আগুন দেয়া থেকে তারা বিরত থাকছে বলে দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে দলটির জন্য বুমেরাংও হয়েছে হরতাল। ২০১৩ সালের ২৬ মে হরতাল ডেকেছিল বিএনপি। দলটির এই ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারমেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করেননি।

যদিও সাক্ষাৎ না হওয়ার জন্য অবস্থানগত পার্থক্যের অজুহাতের কথা বলেছিল বিএনপি। শারমানের সফরকালে হরতাল না ডাকতে অনুরোধ জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বিএনপি তা মানেনি। এই অনুরোধ না রাখাকে ‘অসৌজন্যমূলক’ মনে করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গেল এক দশকে বাংলাদেশে হরতালকেন্দ্রিক সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশে এখন ঘোষিত সময়ের হরতালের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক ও ভোগান্তিপূর্ণ হয়ে উঠছে হরতালের আগের দিনটি। এদিন সন্ধ্যায় গাড়ি পোড়ানো, ভাঙচুর ও প্রাণঘাতী সহিংসতার মহোৎসব শুরু হয়ে যায়।

হরতালে কেউ বের হয়েছেন, কাজে যাচ্ছেন কিংবা ঘরে ফিরছেন—কেউ জানেন না, কে কখন সেই সহিংসতার শিকার হতে যাচ্ছেন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যেতে পারেন যে কেউ। সর্বনাশা হরতালের সময় অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিওবার্তায় কর্মসূচি ঘোষণা করতে দেখা গেছে বিএনপি নেতাদের।

আবার বিএনপির ডাকা হরতালে মানুষের সাড়া মেলে না। বিএনপির ডাকা হরতালে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় যানজটও হতে দেখা গেছে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠা অগণতান্ত্রিকভাবে

বিভিন্ন রাজনৈতিক মতপথের অনুসারীদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে ৪৪ বছর আগে দলটি গঠন করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। প্রথমে তিনি ১৯ দফা অর্থনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে জাগদল নামে রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করেন। শেষ পর্যায়ে এসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্ম হয়।

বলা হয়, দলটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় কিংবা অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যারা হত্যা করেছিল, তাদের মদতদাতাদের অন্যতম জিয়াউর রহমান।

প্রতিষ্ঠার সময় দলটিতে যোগ দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী মশিউর রহমান জাদু মিয়ার অনুসারী ভাসানী ন্যাপের বৃহৎ অংশ, মুসলিম লীগ, জাসদের দলছুট অংশ, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী আরও ব্যক্তি। এরপর থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধীরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে।

গবেষক গোলাম মুরশিদ তার ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’ বইয়ে লিখেছেন: ‘মুজিব হত্যার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের যোগাযোগের কথা বলেছেন অনেকে। তার ব্যক্তিগত ক্ষোভও ছিল যে, তাকে প্রধান সেনাপতি করা হয়নি। তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, তা-ও তাকে উসকানি দিতে উদ্বুদ্ধ করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে মুজিব হত্যা থেকে কেউ যদি সবচেয়ে লাভবান হয়ে থাকেন, তা হলে তার (জিয়া) নামই বলতে হয়।’

শেয়ার করতে ক্লিক করুন