হতাশ হয়ে পড়েছে ১৪ দলের শরিকরা

96
শেয়ার করতে ক্লিক করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ২৯৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে। কিন্তু দলটির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ১৪ দলের জোটের শরিক দলগুলোকে কোনো আসন দেওয়া হয়নি। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন শরিক দলগুলো নেতারা। ফলে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কোনো আসন না পেয়ে অনেকটাই চুপষে গেছে ১৪ দলীয় জোটের শরীকরা। এখন ১৫-২০ টি আসন পেলেই খুশি বলে জানিয়েছেন শরিক দলগুলোর নেতারা।
শরিক দলগুলোর একাধিক নেতা সময়ের আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই ২৯৮ আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগের কাছে আমরা আগে ৫০ টি আসন চাইলেও এখন আর সেই পরিবেশ নেই। যদিও আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জোট নেত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যেকটি শরিকদলকে ন্যূনতম একটি আসন দেওয়ার কথা বলেছিলেন। আর যেসব দলে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকবে তাদেরকে আরও বেশি আসন দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে শরিক দলগুলোকে অন্ততপক্ষে ১৫-২০ টি আসন দিলেও সেটি মেনে নেওয়া যেতে পারে। এরমধ্যে জাসদ (আম্বিয়া) আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে আসবে না। এছাড়া কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি ও গণআজাদী লীগের এমপি প্রার্থী হওয়ার মতো তেমন কেউ নেই। তাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) মোজাফ্ফরকে ২টি, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টিকে ১টি, বাসদ ২টি, সাম্যবাদী দল ১টি, ওয়ার্কার্স পার্টি-৪, জাসদ ৫টি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ৩টি, তরিকত ফেডারেশন ২টি দিলেই হয়। এছাড়া কুষ্টিয়া-২ ও নারায়ণগঞ্জ -৫ আসন ফাঁকা রেখে ২৯৮ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
তারা বলেন, এখনও আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। কবে আলোচনা করবে তার কোনো দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি। ১৪ দলের মুখপাত্র আমির হোসেন আমু জানিয়েছেন, জোট নেত্রী সুযোগ পেলেই ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে বসবেন। এখনও আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আলোচনা করার সুযোগ আছে। এছাড়াও ১৪ দলের শরিকদলগুলো আলাদা আলাদা করে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। এমনকি শরিক দলগুলো স্থানীয় পর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে মনোনয়নপত্রও কেউ কেউ সংগ্রহ করেছেন। এখন আলোচনা করে ঠিক করলেই হয়, শরিকদলগুলোর কোন দলকে কত আসন ছেড়ে দেবে।
১৪ দলীয় জোটের অন্যতম এক শরিক দলের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ১৩টি আসন দিয়েছিল। কারণ গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছিল। এবার বিএনপির নির্বাচনে আসবে বলে কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোট ৫০টি আসন চেয়েছিল। কিন্তু বিএনপি যেহেতু না আসার সম্ভাবনা বেশি। তাই কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের ১৫-২০টি আসন দিলেই খুশি। এখন আর কিছু করার নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখন মুখে কুলুপ এটেছে। তারা ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে কোনো আলাপ আলোচনা না করেই ২৯৮ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এতো এক সঙ্গে চললাম। বিএনপি-জামায়াতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ১৪ দলের শরিকরাই বেশি কথা বলেছেন। এছাড়া কুষ্টিয়া-২ ও নারায়ণগঞ্জ -৫ আসন ফাঁকা রেখে ২৯৮ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কুষ্টিয়া-২ আসনে হাসানুল হক ইনুকে দিলেও। ঢাকা-৮ আসনে রাশেদ খান মেননকে দেওয়া হয়নি। সেখানে দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে। এতে খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতে রয়েছে কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো।
এদিকে, গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলের শরিকদের ১৩ টি আসন দেওয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে জাসদ (ইনু) ৩টি, জাসদ (আম্বিয়া) ২টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৫টি, জেপি মঞ্জু ১টি ও তরিকত ফেডারেশন ২টি আসন দেওয়া হয়। এরমধ্যে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২ আসনে, সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তার ফেনী-১ আসনে ও রেজাউল করিম তানসেনকে বগুড়া-৫ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। জাসদের অন্য অংশের সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়াকে নড়াইল-১ (কালিয়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। এই আসনেই আগের দিন দলীয় মনোনয়নের প্রত্যয়নপত্র পেয়েছেন বর্তমান সাংসদ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বি এম কবিরুল হক মুক্তি। আম্বিয়ার পর তাদের দল থেকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে নৌকার প্রার্থী হওয়ার প্রত্যয়নপত্র নেন মইনুদ্দিন খান বাদল। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ঢাকা-৮ আসনে, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হাসান বাদশা রাজশাহী-২ আসনে, মোস্তফা লুৎফুল্লাহ সাতক্ষীরা-১ আসনে, টিপু সুলতান বরিশাল-৩ আসনে, ইউনুস আলী ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বাশার মাইজভাণ্ডারীকে চট্টগ্রাম-২ এবং তরিকত ফেডারেশনের সদস্য আনোয়ার হোসেন খানকে লক্ষ্মীপুর-১ আসন দেওয়া হয়েছিল। পিরোজপুর-২ আসনটি পেয়েছিলেন জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেন খান মেনন সময়ের আলোকে বলেন, আসন বন্টন নিয়ে আওয়ামী লীগ বা জোট নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এখনও কোনো কথা হয়নি। কবে হবে সেটিও জানি না। তবে ওয়ার্কার্স পার্টি দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করলেও এখনও সুযোগ আছে আলোচনার। সেখানে জোট নেত্রী নৌকায় যে ক’টি মনোনয়ন দেবে, সেখানে আমাদের প্রার্থী থাকবে। আর বাকিগুলোতে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতীকে নির্বাচন করবে।

গত রোববার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২ (ভেড়ামারা-মিরপুর) আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল শেষে গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসুক বা না আসুক, ১৪ দল জোটবদ্ধভাবে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, ১৪ দল জোটবদ্ধভাবেই নির্বাচন করবে। প্রয়োজন হলে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা শরিক দলের প্রার্থীরা ব্যবহার করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে আমি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করব।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তার  বলেন, আমাদের সঙ্গে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। আলোচনা হলে বলতে পারবো কি হবে। হয়তো ৩০ নভেম্বর মধ্যে যে কোনো সময় ১৪ দলীয় জোট নেতাদের ডাকতে পারে। তাহলে বোঝা যাবে কি হবে? আর যদি এমন পরিস্থিতি হয়, তাহলে জাসদ তার নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) আহ্বায়ক রেজাউর রশিদ খান বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জোট নেত্রী আমাদের বলেছিলেন, শরিক দলগুলোর প্রত্যেককেই নূন্যতম একটি আসন দেবেন। তবে কেন্দ্রীয় শরিক দলগুলোর সঙ্গে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। আমার দল থেকে নৌকার মনোনয়নের জন্য তিনটি আসন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছি। যেহেতু আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে, এখনও সময় আছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে আমাদের সঙ্গে জোট নেত্রী বসবেন। তারপর বলতে পারবো, আসলে ১৪ দলীয় শরিক দলগুলোকে নিয়ে কিভাবে ভাবছে আওয়ামী লীগ।
জাতীয় পার্টি জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে এখনও কোনো কথা হয়নি। জোট নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপ হলে বোঝা যাবে তিনি কি করবনে। আওয়ামী লীগ কোথাও ছাড় দিলে সেখানে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবে দলের প্রার্থীরা। আর অন্যরা আমাদের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করবে।
তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী  বলেন, আমরা ১৪ দল জোটের শরিকদের নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। যদিও এখনো সময় আছে। হয়ত খুব শিগগিরই জোট নেত্রী ১৪ দলের শরিক দলগুলোকে ডেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটে ১৪টি দল নেই। এ জোটে দল আছে ১৩টি। এরমধ্যে ১. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ২. জাতীয় পার্টি (জেপি), ৩. জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল(জাসদ), ৪. বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি, ৫. বাংলাদেশ সাম্যবাদি দল(এম. এল), ৬. বাংলাদেশ গনতন্ত্রী  পার্টি, ৭. গণ আজাদী লীগ, ৮. বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল(বাদস), ৯. কমিউনিস্ট কেন্দ্র, ১০. তরিকত ফেডারেশন, ১১. ন্যাপ (মোজাফফর), ১২. গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, ১৩. বাংলাদেশ জাসদ (আম্বিয়া)।
শেয়ার করতে ক্লিক করুন