গণপূর্তে জি কে শামীমের ঘনিস্ট দুই প্রকৌশলীর শাস্তি হলেও ধরাছোয়ার বাইরে অন্য সহযোগিরা

44
শেয়ার করতে ক্লিক করুন
রফিকুল ইসলাম সবুজ:
কমিশনের বিনিময়ে বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীমকে কাজ পাইয়ে দেয়াসহ দুর্নীতির মাধ্যমে ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদ অর্জন করার অভিযোগে দুদকের মামলার চার্জশিট আদালতে গৃহীত হওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এছাড়া কাজ সম্পন্ন করার আগেই জি কে শামীমকে অবৈধ ভাবে অগ্রিম ১০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ ফজলুল হককে বেতন গ্রেড কমানোর শাস্তি দিয়েছে। তবে এই দুই প্রকৌশলীকে শাস্তি দেওয়া হলেও এখনো ধরা ছোয়ার বাইরে রয়ে গেছেন জি কের সহযোগি হিসেবে পরিচিত গণপূর্তের অন্তত ১৫ প্রকৌশলী। সংস্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জি কে শামীমকে ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ ভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজ করার আগেই অগ্রিম বিল পরিশোধের সঙ্গে একাধিক প্রকৌশলী জড়িত থাকলেও তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি।
মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর গণপূর্তের কিছু প্রকৌশলীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে। জি কে সিন্ডিকেটের সদস্যরা মিলে ঠিকাদারি কাজের পাশাপাশি বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেয়া, গোপন টেন্ডার অনুমোদনসহ সব ধরনের কাজ করে আসছিলেন। পঙ্গু হাসপাতালের আধুনিক ভবন নির্মাণ, চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ভবন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, নিউরো সাইন্স, বিজ্ঞান জাদুঘর, র‌্যাব সদরদপ্তরসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প জি কে শামীমের জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (জি কে বিল্ডার্স) করেছে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে ইজিপি এড়িয়ে ওটিএম’র মাধ্যমে প্রকল্পের টেন্ডার শুরু করে প্রকৌশলী সিন্ডিকেট।  ২০১৯ সালে জি কে শামীম গ্রেফতার হওয়ার সময় জিকেবি অ্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে সচিবালয়, র‌্যাব হেড কোয়ার্টার, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ বড় বড় ১৭টি প্রকল্পের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারির কাজ করছিল। অভিযোগ রয়েছে মেসার্স জি কে বিল্ডার্স তার প্রতিষ্ঠানের বাগিয়ে নেওয়া বেশিরভাগ প্রকল্পেরই ব্যয় ও সময় বাড়তো অবিশ্বাস্যভাবে। আর একাজে তাকে সহায়তা করতো গণপূর্তেরই সংস্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। ব্যয় বাড়লে প্রকৌশলীদের কমিশনও বাড়তো। সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের ২৪ নভেম্বর একনেক বৈঠকে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আওতায় ১৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ২০তলা বিশিষ্ট রাজস্ব বোর্ড ভবন নির্মাণ করার কথা ছিল। পরে ভবন ১২ তলা করার সিদ্ধান্ত হলেও জি কে বিল্ডার্স প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে করে ৪৯৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের কাজ কমলেও ব্যয় বেড়ে যায় ৩৫৪ কোটি টাকা। একইভাবে ২০১৩ সালে শুরু হওয়া ‘জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ায় জি কে বিল্ডার্স। প্রকল্পটি শুরুর সময় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও শেষ হয় ৫০০ কোটি টাকায়।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ক্যাসিনোকাণ্ডে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর ক্যাসিনো ও অন্যান্য অবৈধ মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুদক। এতে নাম আসে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দের। ২০২০ সালের ৫ আগস্ট দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ সংস্থাটির কর্মকর্তা নেয়ামুল আহসান গাজী বাদী হয়ে উৎপল কুমার ও তার স্ত্রী গোপা দের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।  গত মঙ্গলবার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে’র বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার চার্জশিট আদালত কর্তৃক গত ১০-১০-২০২৩ তারিখে গৃহীত হয়েছে। তাকে সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮ (২০১৮ সনের ৫৭ নং আইন) এর ৩৯ (২) অনুযায়ী ১০-১০-২০২৩ তারিখ থেকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীমের সঙ্গে যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে ৭ কোটি ৮০ টাকার সম্পদ অর্জন করার কথা বলা হয় মামলায়।
অন্যদিকে কাজ সম্পন্ন করার আগেই আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমকে অবৈধ ভাবে অগ্রিম ১০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করার ঘটনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী, শেরেবাংলা নগর-১ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে রাজশাহীতে চলতি দায়িত্বে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত) মোহাম্মদ ফজলুল হককে বেতন গ্রেড কমানোর শাস্তি দিয়ে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন অভিযুক্ত প্রকৌশলীকে বর্তমান বেতন গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে নামিয়ে দেওয়ার বিষয়ে গত ২৫ জানুয়ারি এক অফিস আদেশ জারি করেন। এতে বলা হয় নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে কাজের আগেই ১০ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ঠিকাদারকে পরিশোধের বিষয়ে প্রকৌশলী ফজলুল হকের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর), ২০০৮-এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে আর্থিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছেন। পরবর্তী সময়ে জামানতের টাকা থেকে তা সমন্বয় করে সরকারের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা মিলেছে। ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগটি আর্থিক শৃঙ্খলাজনিত হওয়ায় চাকরি বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারায় ‘বেতন গ্রেডের নিম্নতর ধাপে অবনতিকরণ বা বর্তমান বেতন গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে নামিয়ে দেওয়ার শাস্তি দেওয়া হলো।’ মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্ট আইনে এটি মূলত লঘু দণ্ড হিসেবে বিবেচিত। কিন্তুু কার্যাদেশ বাতিলের পর জিকে শামীমের পারফরমেন্স সিকিউরিটির অর্থ বাজেয়াপ্ত না করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি টাকা। অথচ এই অগ্রিম বিল দেওয়ার সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী ছাড়াও সংস্লিষ্ট উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারি প্রকৌশলীও জড়িত থাকার কথা। কারণ বিল দেওয়ার আগে কাজের মাপ বহিতে (এমবি-মেজারমেন্ট বুক) তাদের স্বাক্ষর ও মতামত গ্রহণ করার নিয়ম রয়েছে। তাই অগ্রিম বিল দেওয়ার সঙ্গে অন্য যারা জড়িত তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনা উচিৎ ছিল। কিন্তুু অজ্ঞতকারনে তা করা হয়নি।
সংস্লিষ্টরা জানান, রাজধানীর র‌্যাব সদর দফতরের কাজের টেন্ডার আহ্বান করা হয় ২০১৯ সালের জুনে। তখন টেন্ডার নিষ্পত্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (প্রকল্প ও বিশেষ প্রকল্প -পিএনএসপি) ড. মঈনুল ইসলাম। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, প্রকল্পের দরপত্র গণপূর্ত ঢাকা সার্কেল-৩ থেকে আহ্বান ও তৎকালীন ঢাকা গণপূর্ত জোন থেকে মূল্যায়ন করার কথা। র‌্যাব সদর দফতরের কাজের টেন্ডার গণপূর্ত ঢাকা সার্কেল-৩-এর অধীনে। কিন্তু নিয়মনীতি না মেনে গণপূর্ত অধিদফতরের (সদর দফতর) থেকে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্সকে র‌্যাব সদর দফতর নির্মাণের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ঘটনায় ভূমিকা রাখেন তিনি। কিন্তুু এ কাজের সঙ্গে জড়িতরা ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছেন। এছাড়া আরও বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী  জি কে সিন্ডিকেটের সহযোগী হিসেবে পরিচিত বলে তখন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়ে ছিল। কিন্তুু তারা সবাই ধরা ছোয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
জি কে শামীমকে অবৈধ ভাবে অগ্রিম ১০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করার ঘটনায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলুল হককে গুরুদন্ডের পরিবর্তে লঘুদন্ড দেওয়ায় ঘটনায় কয়েকদিন আগে জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মুজিবুল হক। তিনি জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে শাস্তি দাবি করেন। এবিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী র আ ম ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বলেছেন, দূর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান জিরোটলারেন্স। কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উত্থাপিত হলে তদন্তের মাধ্যমে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে মন্ত্রনালয়ের সচিব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবে কেউ মন্ত্রনালয়ের আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্দ হলে আপীল করার সুযোগ রয়েছে। সুত্র: সময়ের আলো।
##
শেয়ার করতে ক্লিক করুন