রফিকুল ইসলাম সবুজ:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৮ দিন। নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার করে সুক্ষ কারচুপির ষড়যন্ত্রের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছেন ভোটের মাঠে থাকা প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াত জোট নেতারা। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে প্রশাসন জামায়াত সমর্থিত কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রনে। আর জামায়াত-এনসিপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে প্রশাসন বিএনপিপন্থীদের নিয়ন্ত্রনে। এনিয়ে সম্প্রতি প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনে পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনের ঘটনাও ঘটেছে। তবে জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন ২০১৮ সালের মতো প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোটে নজিরবিহীন কারচুপি করার সুযোগ এবার নেই। কারণ ঐসময়ে পুরো জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ছিলো একমুখী অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রনে। কিন্তুু এবার প্রশাসন একমুখী নয়। এক দিকে অন্তবর্তীকালিন সরকার অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারনে প্রশাসনকে ব্যবহার করে কোন দল বা গোষ্ঠী ভোটে বড় ধরনের কারচুপি করতে পারবে না। তাছাড়া এবার মাঠে দুই পক্ষই শক্ত অবস্থানে থাকায় কারচুপি করতে গেলে বাঁধারমুখে পড়বে। তবে সুষ্ঠু ভোটের জন্য আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
নির্বাচন পরিচালনায় মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তারা। আর এই দায়িত্ব মূলত জেলা প্রশাসক ও ইউএনওরাই পালন করেন। তাদের সহযোগিতা করেন এসপি ও ওসিরা। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য নিয়োগ পাওয়া ৬৯ রিটার্নিং কর্মকর্তার মধ্যে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র তিনজন। আর বাকি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জন জেলা প্রশাসক। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালিন ক্ষমতাসিন আওয়ামী লীগকে জয়ী করার জন্য দিনের ভোট আগের রাতে হওয়ার সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তারাও জড়িত ছিলেন বলে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই অপরাধে গত বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে কর্মরত যুগ্ম সচিব ও সমপর্যায়ের পদে থাকা প্রশাসনের ৩৩ জন কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। তারা ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর হয়েছে, এমন অন্তত ২২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার করে কারচুপির ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে রাজনৈতিক দলগুলো পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন এবারের ভোটে ঢালাও কারচুপির সুযোগ তেমন একটা থাকবে না। কারণ ভোটের মাঠে রাজনৈতিক দুই প্রতিপক্ষ যেমন শক্ত অবস্থানে রয়েছে তেমনি কর্মকর্তাদের মধ্যেই বিএনপি ও জামায়াতপন্থীরা সক্রিয় রয়েছেন। মাঠ প্রশাসনে রিটার্নি ও সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তারা এবং এসপি ও ওসিরাও সবাই একটি দলের পক্ষে নয়। ফলে কোন কর্মকর্তা চাইলেই কোন বিশেষ দলের পক্ষে ভোট কারচুপির সুযোগ পাবেন না। অন্যদের বাধারমুখে পড়তে হবে। যেটা ২০১৮ সালের ভোটে ছিল না। তখন কর্মকর্তারা সবাই ক্ষমতাসিন দলকে খুশি করার জন্য আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থীদের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিলো।
এবার বিগত তিনটি নির্বাচনের মতো প্রশাসনকে ব্যবহার করে একতরফা ভাবে ঢালাও কারচুপি করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, এবার ঢালাও কারচুপি না হলেও কিছুটা পক্ষপাতিত্ব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে যেদল প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাবে তারা সেখানে কারচুপির চেষ্টা করবে। আর আমলারা হাওয়ার অনুকুলে পাল তুলবে। বিগত ভোটে কারচুপির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেওয়ার কারনে আমালারা একটা চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে এবার হয়তো তারা জোরালো ভাবে দলীয় ভুমিকায় অবতীর্ন হবে না। একারনে নির্বাচন এবার একতরফা হওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকারের কোন ইঙ্গিত যদি আমলাদের ওপর না থাকে তাহলে ভোট নিরপেক্ষ হবে। আর গোপনে কোন সিদ্ধান্ত হলেও এবার ডিসি, ইউএনও এবং এসপি ওসিরা সরাসরি কোন দলের পক্ষে ভুমিকা পালন করতে পারবে না। ফিরোজ মিয়া বলেন, এবার ভোট নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করবে রাজনৈতিক শক্তিগুলো। যারা যেখানে শক্তিশালী সেখানে তারা প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে। এক্ষেত্রে প্রশাসন যদি নিরপেক্ষতা দেখাতে গিয়ে নির্লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকও মনে করেন এবার ভোটে প্রশাসনকে ব্যবহার করে কারচুপির সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এবার কোন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন হচ্ছে না। দল নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার থাকায় ভোটে প্রশাসন নিরপেক্ষ ভুমিকা পালন করবে। তাছাড়া ভোটের সময় সরকারের পক্ষ থেকে কোন বিশেষ দলের পক্ষে থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রশাসন সেই নির্দেশ মানতে বাধ্য নয়। ফলে এবারের ভোটে দিনের ভোট রাতে কিংবা ঢালাও কারচুরি সুযোগ কোন পক্ষ পাবে না। তবে প্রশাসনের লোকজন যদি মনে করে কোন একটি দল ভোটে জিতে যাচ্ছে তাহলে হয়তো কর্মকর্তারা সেই দলের পক্ষে থাকতে চাইবে। ঐ দলের বিপক্ষে জোরালো ভুমিকা নাও নিতে পারে ভোটের পরে যাতে তিনি ভাল পদায়ন পান তা ভেবে। যে দল জয়ী হবে সেই দলের প্রার্থীকে হয়তো ভোটের দিনে রাগাতে চাইবে না কর্মকর্তারা। তবে ২০১৮ সালের মতো আগে ব্যালট দেবে না এবার। তিনি বলেন এবার সবাই ভোটের দিন কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করবে। যারা সৎলোকের শাসনের কথা বলছে তারাও ভোটে জয়ী হওয়ার জন্য চাইবে কেন্দ্র দখলে রাখতে। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে কঠোর ভুমিকা পালন করতে হবে। প্রশাসন ও পুলিশ কঠোর ভুমিকা পালন করলে এবারের ভোট তুলনামুলক সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে বলে তিনি মনে করেন।
কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমীন টুলী বলেন, ভালো নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলের এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকবে। তারা যদি নির্বাচনকে ঝামেলায় না ফেলতে চায়, নিজেদের মধ্যে কোনো ধরনের হানাহানি বা ভোটকেন্দ্র দখল বা ভোটারকে বাধা দেওয়া বা কোনো প্রার্থীকে বাধাগ্রস্ত করা, তার প্রচারণায় বা কোনো রাজনৈতিক দল আরেকটার বিরুদ্ধে এআই ব্যবহার করে সোশাল মিডিয়াতে বড় ধরনের কোনো ডিজাস্টার না করে ফেলে। যদি সত্যিই আমরা ভালো নির্বাচন করতে চাই, সরকারের সহযোগিতা যেমন দরকার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং যারা ভোটকেন্দ্রে কাজ করবে তারা এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসাবে যারা কাজ করছে।
নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা হারানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ (অব.)। গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সব ভোটার যাতে ভোটকেন্দ্রে এসে নিরাপদে ভোট দিতে পারে এটা নিশ্চিত করতে হবে। এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের ভোটের মাধ্যমে জিততে হবে, দুই নম্বরির কোনো সুযোগ নেই। ভোটকেন্দ্র ও কেন্দ্রর বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সবসময়ই প্রস্তুত থাকবে হবে, যাতে কেউ শৃঙ্খলা ভঙ্গের চিন্তাও না করতে পারে। আর চিন্তা করলেও যাতে কেউ বাস্তবায়ন করতে না পারে। এছাড়া ভোটকে উৎসবমুখর করাসহ সবাইকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।
##





