নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। গণভোটের জন্য ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রনালয়। এর মধ্যে গণভোট নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারের জন্য নির্বাচনি ব্যয় থেকে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ছয় মন্ত্রণালয়কে। এছাড়া সরকারের উপদেষ্টাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গণভোটে ‘হ্যা’ বা ‘না’ ভোট দিলে কি পাওয়া যাবে সেই প্রচারনাও চালাচ্ছে। কিন্তু অনেকের কাছেই এখনও পর্যন্ত গণভোটের বিষয়বস্তু স্পষ্ট নয়। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গণভোটে সাধারণ মানুষ কি পাবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে ভোটারদের মধ্যে। বিশেষ করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর জয় পরাজয়ের সাথে জুলাই সনদের সম্পর্ক কতটুকু কিংবা ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলেই বা সনদের কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়েও ভোটারদের মনে সংশয় রয়েছে।
সংস্লিষ্টরা জানান, নির্বাচনে ভোটারদেরকে একইসঙ্গে দুটি ব্যালট দেওয়া হবে। একটি জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট এবং অন্যটি গণভোটের। গণভোটে চারটি বিষয়ের ওপর করা একটি প্রশ্নেই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন ভোটাররা। সাদা ব্যালট পেপারের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া যাবে। আর গোলাপি রঙের ব্যালটে জুলাই সনদের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দিতে হবে। বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারনা চালানো হচ্ছে। ব্যালটে গণভোটে চারটি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন করা হবে, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ বিষয়গুলো হলো ১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। ২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। ৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
সংস্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথমে জাতীয় নির্বাচনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে দুই হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ পায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরে সরকার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট করার নির্দেশনা দিলে সে মোতাবেক অর্থ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত বাজেটের চাহিদা পাঠানো হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইসি ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ পেয়েছে। সব মিলিয়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। ইসি গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, কর্মী, যাতায়াত, খামসহ নির্বাচনি সামগ্রী বাবদ খরচ করছে। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের এনওসির পরিপ্রেক্ষিতে এলজিইডি, সাংস্কৃতি, ধর্ম, তথ্য, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গণভোটের পক্ষে প্রচারের জন্য ইসির বরাদ্দ থেকে ১৪০ কোটি টাকা অর্থ নিয়েছে। এর মধ্যে
গণভোটের প্রচারের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪৬ কোটি টাকা, তথ্য মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা, ধর্ম মন্ত্রণালয় ৭ কোটি টাকা, এলজিইডি মন্ত্রনালয় ৭২ কোটি টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালালে এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। পরে নির্বাচন কমিশন গত বৃহস্পতিবার সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে এক চিঠিতে জানিয়েছে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন। তবে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে বা ‘না’ এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে কোনোভাবে আহ্বান জানাতে পারবেন না। এর পর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ‘হ্যা’ ভোট দিলে জনগন কি পাবে আর ‘না’ ভোট দিলে কি পাবে সে বিষয়ে সচেতনাতামুলক প্রচারনা শুরু করে। তবে রোববার সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবন ও মন্ত্রনালয়ে হ্যা ভোটের পক্ষে লাগানো ব্যানার ও ফেষ্টুন দেখা গেছে।
অন্যদিকে সরকারের পাশাপাশি জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে সারা দেশে গণভোটে হ্যা এর পক্ষে প্রচারনা চালালেও জাপা ও বাম দলগুলো না এর পক্ষে প্রচারনা চালাচ্ছে। তবে বিএনপি এতোদিন সরাসরি হ্যা এর পক্ষে প্রচারনা না চালালেও কয়েক দিন আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি নির্বাচনী জনসভায় হ্যা এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহবান জানিয়েছেন। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারনার পরও গণভোট নিয়ে সাধারন ভোটারদের মধ্যে নানা সংশয় রয়েছে। তাছাড়া চার প্রশ্নের একটি উত্তর ‘হ্যা’ বা ‘না’ নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে এবং একইসাথে গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয় রাখা হবে। সেখানে চার বিষয়ের বাইরে অন্যগুলো ব্যালটে থাকছে না। সেকারণেই মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটের ইস্যুগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তুু রাজনৈতিক দলগুলোতো আর সমস্ত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না। তার পর সংবিধান অনুযায়ী গণভোট নেওয়ারই কোন সুযোগ নেই। সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হলে এই গণভোট কতটুকু টিকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ গণভোট নিয়ে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে এটাইতো বেআইনী ও সংবিধান পরিপন্থী। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে হয়তো এখন এই বিষয়টি নিয়ে কোন আলোচনা তেমন একটা হচ্ছে না। তবে এক সময়তো দেশ একটা সুষ্ঠু ধারায় ফিরে আসবে তখন এটার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সেই কারনে ২০ বছর আগের মার্শাল ল’ কিন্তুু পরবর্তীকে বেআইনী ঘোষিত হয়েছে।
সরকারের সংস্লিষ্টরা জানান, গণভোটে হ্যাঁ জয় পেলে আগামী সংসদের সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিন বা নয় মাসের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কারে বাধ্য থাকবে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে, প্রয়োজন নেই গণভোটেরও। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- সংবিধান সংশোধনে সংসদের নিম্নকক্ষে দুই তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। অন্যদিকে সংবিধানের প্রস্তাবনা- ৮,৪৮, ৫৬ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোট লাগবে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে যদি ‘না’ জয়ী হয় তাহলে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা হবে তা হচ্ছে সংবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজয়ী হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। যদিও তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ এটা বাস্তবায়ন করতে, তখন কিন্তু বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতার জায়গাটা দুর্বল হয়ে যাবে।




