সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে সরব বিরোধী দল, অন্য কমিশনের সুপারিশে নীরব সবাই

2
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

রফিকুল ইসলাম সবুজ:
ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য  দিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালিন সরকার। গঠন করা হয়েছিল ১১টি সংস্কার কমিশন। কমিশনগুলো আড়াই হাজারেরও বেশি সুপারিশ সরকারের কাছে জমাও দিয়েছিল। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন ছাড়া বাকি ১০টি কমিশনের দুই হাজারেরও বেশি সুপারিশ রয়েছে যা সরকার অধ্যাদেশ জারি করে অথবা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করতে পারত। কিন্তুু দৃশ্যমান কোন সংস্কার না হওয়ায় এগুলো হিমাগারেই রয়ে গেছে। তবে নির্বাচনের পর এখন সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে শুধু সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি। বিরোধী দলীয় জোট প্রকাশ্যে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের দাবি তুলছে। তারা বলছে, বর্তমান রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংকটের মূল কারণ সংবিধানের কিছু বিতর্কিত অনুচ্ছেদ। তবে একই সময়ে প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, অর্থনীতি ও দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত অন্যান্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। আর বিরোধী দলগুলোও এসব বিষয়ে অনেকটা নীরব। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা কি কেবল সংবিধানেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

বিরোধী জোটের একাধিক নেতা বলেছেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ ব্যবস্থার প্রশ্নটি এখন আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে যে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতে জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কারে সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাবেন এবং জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা। সংবিধান সংশোধনে সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণ সংবিধান সংশোধনের জন্য নয়, সংস্কারের জন্য রায় দিয়েছে। সংস্কার ও সংশোধনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের বিষয় আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় পড়ে, কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে হওয়া সংস্কারের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও হাইকোর্ট বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে আদালতের রায়ে বিভিন্ন সাংবিধানিক সংশোধনী বাতিল হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সংবিধান পরিবর্তনের বিতর্ক সামনে আনায় অন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ইস্যুগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে। বিগত অন্তবর্তীকালিন সরকারের সময়ে গঠিত বিভিন্ন কমিশন প্রশাসনিক জবাবদিহি, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, পুলিশ সংস্কার নিয়ে নানান সুপারিশ দিলেও সেগুলোর অধিকাংশ এখনো ফাইলবন্দি।

প্রথম ধাপে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, সংবিধান সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনসহ ছয়টি কমিশন গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন, শ্রম সংস্কার কমিশন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনগুলো আড়াই হাজারেরও বেশি সুপারিশ দিলেও  অন্তবর্তীকালিন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুদকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৩৬৭টি সংস্কার প্রস্তাবকে ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ ঘোষণা করেছিল। যার মধ্যে বিভিন্ন কমিশনের মাত্র ৩৭টি সুপারিশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।

সংস্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আশু করণীয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন, গণশুনানি এবং নাগরিকদের অভিযোগ শোনা, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী নাগরিক কমিটি গঠন, মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা হ্রাস করা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ আর রাজস্ব বোর্ড একসঙ্গে এক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা, জেলা প্রশাসককে জেলা কমিশনার হিসেবে অভিহিত করা, উপজেলা পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন পুনর্গঠন করা। সংস্কার কমিশন আশু করণীয় হিসেবে জুডিশিয়াল সার্ভিস সদস্যদের জন্য আচরণবিধি নির্ধারণ, ফৌজদারি মামলা তদন্তে আলাদা ফৌজদারি সার্ভিস, বাণিজ্যিক আদালত গঠন, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আদালতে সহায়ক কর্মচারী নিয়োগ, প্রতিটি আদালতে ইনফরমেশন ডেস্ক স্থাপন, বিভিন্ন মামলায় বদলি হওয়া পুলিশের অনলাইনে সাক্ষ্যগ্রহণের ব্যবস্থার সুপারিশ করেছিল।

মন্ত্রণালয়গুলো যুক্তিসংগতভাবে হ্রাস করে সরকারের সব মন্ত্রণালয়কে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টি বিভাগে পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করেছিল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। একই সঙ্গে সব মন্ত্রণালয়কে সমপ্রকৃতির পাঁচটি স্বল্পমেয়াদী গুচ্ছে বিভক্ত করা, একটির বদলে তিনটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কোটা ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশে আনার মতো প্রস্তাবও করেছিল।

এছাড়া আশু বাস্তবায়নযোগ্য পুলিশ সংস্কার কমিশনের ১৩টি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে পুলিশ কমিশন ও পুলিশের জন্য পরিপূর্ণ মেডিকেল সার্ভিস গঠন; রাতে কারও বাসায় তল্লাশির সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি বা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ; এফআইআরবহির্ভূত আসামি গ্রেপ্তার না করা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষার জন্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের আশু বাস্তবায়নের তালিকায় থাকা ৩৮টি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি নীতিমালা প্রণয়ন, বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য আচরণ বিধিমালা জারি, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস প্রতিষ্ঠা, বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা।

এছাড়া দুদক সংস্কার কমিশনের ৪৩টি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে দুদক আইন সংশোধন করে কমিশনারের সংখ্যা পাঁচজনে উন্নীতকরণ, দুদক কমিশনারের মেয়াদ পাঁচ বছর করা, রাষ্ট্রীয় ও আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসন ও প্রতিরোধ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন, আয়কর আইনের একটি ধারা সংশোধন করে দুদককে কোনো তথ্য বা দলিল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ। উচ্চমাত্রার দুর্নীতি তদন্তে বিভিন্ন এজেন্সির সমন্বয়ে আলাদা টাস্কফোর্স গঠন, পর্যায়ক্রমে সব জেলায় দুদকের জেলা কার্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংস্কার একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হওয়ায় বিরোধী দলগুলো এটি নিয়ে সরব থাকলেও প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো অপেক্ষাকৃত “কম দৃশ্যমান” বিষয়গুলো গুরুত্ব হারাচ্ছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসব খাতের সংস্কারই বেশি প্রভাব ফেলে। সরকারি সূত্রগুলো অবশ্য বলছে, সংস্কার কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ধাপে ধাপে সুপারিশ পর্যালোচনা করছে। তবে তারা স্বীকার করছে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়ন কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, সংবিধান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু সংবিধান পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রের সব সংকট দূর হবে না। প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তিনি বলেন, আমরা দেখছি বিভিন্ন কমিশন বহু সুপারিশ দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার খুব সীমিত। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া আংশিক হয়ে যাচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। সবাই সংস্কারের কথা বলছে, কিন্তু কোন সংস্কার আগে হবে, কীভাবে হবে তা নিয়ে স্পষ্ট রূপরেখা নেই। নির্বাচন ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমলাতন্ত্র হচ্ছে দেশের সংস্কারের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। দুদক সংস্কার কমিশনের প্রায় সবগুলো প্রস্তাবনায় সব রাজনৈতিক দল একমত হলেও সেগুলোর কোনও অগ্রগতি নেই। প্রতিটি সংস্কার কমিশন থেকেই আশু করণীয় বিষয়গুলো অন্তবর্তীকালিন সরকারের সময়ে করার কথা থাকলেও অনেক সংস্কারই হয়নি।

সংবিধান সংশোধন এবং বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগোতে চায় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, যেসব সুপারিশ ও অধ্যাদেশ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও পরিমার্জন শেষে সংসদে উপস্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া জুলাই সনদের অনেক বিষয় বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার নামে নতুন সংবিধান তৈরির কোনো প্রয়োজন নেই-সংশোধনের মাধ্যমে সব পরিবর্তন সম্ভব।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন