বিরোধী দলের মিছিল, ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে সংসদ শুরু

2
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

 

← Back

Thank you for your response. ✨

নিজস্ব প্রতিবেদক:
অন্তর্বর্তী সরকারের পথ পেরিয়ে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০ মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মধ্যদিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা ফের শুরু হয়েছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদের অধিবেশন কক্ষে স্পিকারের আসন খালি রেখেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। পরে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাব মোতাবেক বিএনপির সিনিয়র সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। প্রথম দিনেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদে বিরোধী দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা ওয়াক আউট করেন। রাষ্ট্রপতি সংসদে প্রবেশ করলে তার উদ্দেশ্যে জুলাইয়ের গাদ্দার লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন বিরোধী দলের এমপিরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই সংসদ কক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

অধিবেশনে মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ স্পিকার ও ব্যারিষ্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। অধিবেশনে শোক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। ওই অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধনী ভাষণ দেন। পরবর্তীতে স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ বিগত দিনে মৃত্যুবরণকারী সংসদ সদস্য ও জাতীয় নেতাদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তারেক রহমান এই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রবেশ করেন।

অধিবেশনের শুরুতে সংসদ সচিবালায়ের সচিব কানিজ মাওলা কার্যক্রমের সূচনা করেন। তারপর বেলা ১১টা ৫ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রামে সব শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, দেশে কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। সংসদ নেতাসহ অধিবেশন কক্ষ যখন ভরপুর সেই সময়টিতে স্পিকারের চেয়ার ফাঁকা ছিল। এসময় সংসদ নেতা তারেক রহমান সংসদ অধিবেশনকে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসনকে সভাপতি হিসেবে নাম প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাবে বিএনপির মহাসচিব, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণ সমর্থন জানান। এরপর বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাবকে সমর্থন জানান। তিনি বলেন, আমরা এই নামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। তবে প্রস্তাবটি নিয়ে আগে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো হত। এমপিরা টেবিল চাপড়ে তাতে সায় দিলে সরকারির দলের প্রথম সারি থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন উঠে যান। এরপর অধিবেশ কক্ষ থেকে বের হয়ে হুইল চেয়ারে করে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করতে চতুর্থ তলায় যান তিনি। এই সময়ে সভাপতির আগমন বার্তা ঘোষণা করা হয়। বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্পিকারের আসনে বসার পর এমপিরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিবাদন জানান। তিনি শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন করেন।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশনে আধঘন্টার জন্য বিরতি দেওয়া হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি সংসদ ভবনে তাঁর কার্যালয়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান। পরে বেলা ১২ টা ৫৫ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ কক্ষে প্রবেশ করে তাঁর আসনে বসেন। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে স্পিকারের মাইকে শব্দ হচ্ছিল না। এ কারণে অধিবেশনের কাজ শুরু করতে একটু দেরি হয়। প্রায় তিন মিনিট পরে একটি হ্যান্ড মাইকে বক্তব্য শুরু করেন স্পিকার। এ সময় সংসদ সদস্যদের অনেকেই দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান যে, তাঁরা বক্তব্য শুনতে পাচ্ছেন না। তখন স্পিকার যান্ত্রিক গোলোযোগের কথা জানান এবং সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। এরমধ্যে জোহরের আজান শুরু হলে ২০ মিনিটের জন্য বিরতি দেওয়া হয়।

নামাজের বিরতির পর বেলা দেড়টার একটু পরেই সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। আর এই সংসদ গণতন্ত্রের প্রতীক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন। স্পিকার বলেন, বিভিন্ন সময় স্বৈরশাসকের আগমন ঘটেছে। বাংলাদেশের জনগণ লড়াই করেছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট জনগণকে বিদায় দেওয়া হয়েছে। এই অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানান। স্পিকার আরও বলেন, জনগণ সংসদের কার্যক্রম দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়পক্ষ জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করবে বলে আশা করেন স্পিকার। নিরপেক্ষতার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বলেন স্পিকার। তিনি বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ, এই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।
অধিবেশন চলাকালে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ

সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতির আগমণ বার্তা ঘোষণা করলে বিরোধী দলীয় সদস্যরা বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভের মধ্যেই বিউগলের সুর বেজে ওঠে। রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করে স্পিকারের ডান পাশে রাখা নির্ধারিত আসনের সামনে দাড়ান। তখন জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে এবং অধিবেশন কক্ষের মনিটরে জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়। এসময় সরকার দলীয় সদস্যরা দাড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালেও বিরোধী জোটের সদস্যরা নিজেদের আসনে বসে পড়েন। তখন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সংসদের কর্মকর্তারা জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিরোধী দলীয় সদস্যদের দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তখন কেউ কেউ দাঁড়ালেও কয়েকজন সদস্য বসে ছিলেন। তবে কিছু সময় পর জামায়াত জোটের সদস্যদের প্রতিবাদ বন্ধ রেখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষে নির্ধারিত আসনে বসেন রাষ্ট্রপতি। অন্যদিকে ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ কর’ লেখা প্লাকার্ড হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা। তারা রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে ‘খুনী’, ‘কিলার চুপ্পু’, ‘ফ্যাসিস্ট চুপ্পু’, ‘গেট আউট চুপ্পু’ বলতে থাকেন। এসময় স্পিকার তাদেরকে শৃখলা বজায় রাখার জন্য বারবার অনুরোধ জানান। আর রাষ্ট্রপতি তার জন্য নির্ধারিত ডায়াসের সামনে দাড়িয়ে থাকেন। এই হট্টগোলের মধ্যে বিএনপির কয়েকজন এমপি বলতে থাকেন, আপনারা কাজটি ঠিক করছেন না, রাষ্ট্রপতি অর্ধেক মানছেন, অর্ধেক মানছেন না। তাকে অসম্মন করছেন। অধিকাংশ সরকার দলীয় সদস্যরা চুপচাপ বসে ছিলেন। এসময় প্রধানমন্ত্রীকে তার পাশে থাকা এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।

অন্যদিকে বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা. আব্দুল্লাহ মো. তাহের, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে শ্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় তারা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ-গণতন্ত্র এক সাথে চলবে না’, ‘ফ্যাবিবাদের দোসররা, হুশিয়ার সাবধান’,। তারা টেবিল চাপড়াতে ও চিৎকার করতে থাকেন। বিক্ষোভকালে মাইক ছাড়াই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচমেন্ট, পদত্যাগ ও গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান মাইক ছাড়াই বলেন, এই রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের সহযোগি, দালাল। এই সংসদে আমরা তার ভাষণ মেনে নিতে পারি না। এ পর্যায়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ আসন ছেড়ে রাষ্ট্রপতির ডায়াসের দিকে তেড়ে যান। কিন্তু তাকে বাধা দেন বিরোধী দলীয় উপনেতা। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে বিরোধী দলীয় সদস্যদের বাইরে নিয়ে যান। প্রায় চার মিনিট অচলাবস্থার পর রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শুরু করেন। এরমধ্যেও বিরোধী দলের বিক্ষোভ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে শ্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে যান বিরোধী দলীয় সদস্যরা। পরে রাষ্ট্রপতি তার নির্ধারণ ভাষণ শেষ করে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। পরে স্পিকার আগামী রবিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত অধিবেশন মূলতবি করেন।

এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া সংবিধান অনুযায়ী একটি বাধ্যবাধকতা। আমরা সংবিধানের বিধান ও জাতীয় সংসদের রেওয়াজ অনুসরণ করতে চাই। দয়া করে আপনারা খারাপ কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন না। তবে স্পিকারের আহ্বানের মধ্যেই বিরোধী দলের সদস্যরা স্লোগান দিতে থাকেন। সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন