সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনে বড় জট জুলাই সনদ ও ইশতেহারের দ্বন্দ্ব

2
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

রফিকুল ইসলাম সবুজ:
সংসদের উচ্চকক্ষ হবে ১০০ সদস্যের—এ নিয়ে মোটামুটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু কার ভোটে, কোন অনুপাতে এবং কতটা ক্ষমতা নিয়ে এই কক্ষ গঠিত হবে—সেই প্রশ্নেই আটকে গেছে উচ্চকক্ষের ভবিষ্যৎ। জুলাই জাতীয় সনদে জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে (পিআর) ১০০ সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব থাকলেও বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হয়েছে। শুধু গঠনপদ্ধতিই নয়, সংবিধান সংশোধনসহ উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নিয়েও রয়েছে ভিন্ন অবস্থান। ফলে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের জায়গায় তৈরি হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। কোন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে, উচ্চকক্ষের সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত বা মনোনীত হবেন এবং নিম্নকক্ষের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন ব্যস্ত সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। কমিটির আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিশিষ্টজনদের মতামত নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। বর্তমান সংসদ হবে নিম্নকক্ষ এবং ১০০ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে উচ্চকক্ষ। উচ্চকক্ষের আসন জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর পাওয়া মোট ভোটের আনুপাতিক হারে বণ্টনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একটি দল জাতীয় নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, উচ্চকক্ষে তার প্রতিনিধিত্বও সেই অনুপাতে নির্ধারিত হবে।
অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও সেখানে উচ্চকক্ষে দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের অনুপাতের কথা বলা হয়েছে। দলটির ইশতেহারে উচ্চকক্ষে বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও অন্যান্য পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করার কথাও রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানেই তৈরি হয়েছে মৌলিক দ্বন্দ্ব। কারণ জাতীয় নির্বাচনে ভোটের অনুপাত এবং নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের অনুপাত এক নয়। কোনো দল তুলনামূলক কম ভোটে বেশি আসন পেলে দুই পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্বেও বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। শুধু সদস্য বাছাই নয়, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নিয়েও জুলাই সনদ ও বিএনপির ইশতেহারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জুলাই সনদে অর্থবিল ও আস্থাভোট ছাড়া নিম্নকক্ষে পাস হওয়া বিল উচ্চকক্ষে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না। তবে সংশোধনের সুপারিশ করে তা নিম্নকক্ষে ফেরত পাঠাতে পারবে। কোনো বিল সর্বোচ্চ দুই মাস আটকে রাখার পর তা উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে বলে গণ্য হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত যেকোনো বিল উচ্চকক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করার বিধান রাখা হয়েছে। বিএনপির ইশতেহারে উচ্চকক্ষকে তুলনামূলক পর্যালোচনামূলক ভূমিকায় রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সেখানে সংবিধান সংশোধনী, অর্থবিল, আস্থাভোট এবং জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধ পরিস্থিতির বিষয় ছাড়া অন্য বিল উচ্চকক্ষে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল এক মাসের বেশি আটকে রাখলে সেটি অনুমোদিত হয়েছে বলে গণ্য করার প্রস্তাব রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে উচ্চকক্ষকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে আপত্তিও জানানো হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, উচ্চকক্ষ আইন পর্যালোচনা ও সুপারিশ করতে পারবে, কিন্তু সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার পাওয়া উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের হাতেই থাকা উচিত।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলীয় জোটকে কমিটির ৫ জন সদস্য দেওয়ার আহবান জানানো হলেও তারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছে। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন বিশেষ কমিটির কাজ হলো জুলাই জাতীয় সনদকে ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করা। গত ২০ সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় বৈঠকের পর বিশেষ কমিটির সভাপতি জানান, রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারক ও বিচারপতি, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্যও জানানো হয়েছে।
এদিকে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। সম্প্রতি সিপিডির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মূল সমস্যা সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট হওয়া নয়; বরং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের আধিপত্য এবং সংসদীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল জবাবদিহি। দেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামো এবং তুলনামূলকভাবে সমজাতীয় সামাজিক কাঠামোর কারণে উচ্চ কক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রাকৃতিক প্রয়োজন ফেডারেল রাষ্ট্রগুলোর মতো নয়। গবেষণায় বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, উচ্চকক্ষ নিজে থেকেই জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশের সংসদের দুর্বলতার মূল কারণ কাঠামোগত নয়, বরং বিদ্যমান সংসদীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহির ঘাটতি। তাঁর মতে নতুন একটি কক্ষ যুক্ত করার পরিবর্তে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, প্রশ্নোত্তর, নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদীয় তদারকি এবং সংসদীয় বিতর্কের কার্যকারিতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি উচ্চকক্ষকে দলীয় পরিচয়ের অনির্বাচিত ব্যক্তিদের জন্য ‘এলিট ক্লাব’ হয়ে ওঠার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে সেটি নিম্নকক্ষের ‘রেপ্লিকা’ হয়ে যেতে পারে এবং দলীয় আধিপত্য আরও বাড়তে পারে। তাই তিনি মনে করেন দলগুলোর ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চ কক্ষ গঠন হওয়া উচিৎ।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান সংবিধানে জাতীয় সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট। ফলে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধনী বিল সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস করার বিধান রয়েছে। নতুন উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পর ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের ভূমিকা কী হবে, সেটিও একই সঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রথমবার উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য বর্তমান নিম্নকক্ষকেই সাংবিধানিক পরিবর্তন আনতে হবে। এরপর প্রস্তাবিত কাঠামো কার্যকর হলে ভবিষ্যতের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় দুই কক্ষের সম্পর্ক কী হবে, সেটি হবে নতুন সাংবিধানিক বাস্তবতা। ফলে সংসদের উচ্চকক্ষ এখন আর শুধু একটি সংস্কার প্রস্তাব নয়; এটি পরবর্তী সংসদীয় কাঠামো, আইন প্রণয়ন এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বিষয়। ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ নিয়ে নীতিগত সমর্থন থাকলেও ভোটের অনুপাত না আসনের অনুপাত, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব না বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ, পরামর্শ না অনুমোদনের ক্ষমতা—এসব প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উচ্চকক্ষের সাংবিধানিক রূপ চূড়ান্ত হচ্ছে না।
জাতীয় সংসদীয় বিরোধী দলীয় হুইপ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন,  সরকার মুখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বাদ দিতে তৎপর রয়েছে। বিশেষ করে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলা নিয়ে তারা আপত্তি করছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদের আলোকে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চ কক্ষ গঠন করা না হলে এর কোন সুফল পাওয়া যাবে না।
সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উচ্চকক্ষ ফেডারেল ব্যবস্থার রাজ্য প্রতিনিধিত্বকারী কক্ষের মতো হবে না। বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা এবং রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়ার ধারণা আলোচনায় রয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে যেসব বিষয়ে কোনো দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলোও সংশ্লিষ্ট ভিন্নমতসহ বিবেচনা করা হবে। জুলাই সনদের বাইরে নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা কিছু সাংবিধানিক প্রস্তাবও কমিটি বিবেচনা করবে।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন