সচিব পদোন্নতিতে এখনো অটুট ‘সুবিধাভোগী বলয়’, বদলায়নি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সংস্কৃতি

2
শেয়ার করতে ক্লিক করুন

রফিকুল ইসলাম সবুজ:
রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু সচিব পদে সাম্প্রতিক পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের অন্দরে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে পুরোনো ‘সুবিধাভোগী বলয়’ এখনো অটুট রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মেধা ও জ্যেষ্ঠতাকে উপেক্ষা করে বিশেষ বলয়ের প্রতি আস্থার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার ফলে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিসিএস (প্রশাসন) ১৮ ব্যাচের চার জন অতিরিক্ত সচিবকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। তারা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (সমন্বয় ও সংস্কার) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়মিত পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং বিদেশে দূতাবাসে লাভজনক পদায়নের সুযোগ পেয়েছেন। অথচ একই ব্যাচের মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা কর্মকর্তাকে সচিব পদে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই ব্যাচের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত থেকেছেন ‘বিএনপি সমর্থক’ রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও তারা উপেক্ষিত হওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে বঞ্চিতদের একটি বড় অংশের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

একাধিক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি বিসিএস ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের সচিব পদোন্নতি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ ওই ব্যাচের মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা কর্মকর্তাকে সচিব পদোন্নতির বিবেচনায় না এনে বরং মেধাক্রমের নীচে থাকা কর্মকর্তাদের সচিব পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ মেধা তালিকায় প্রথমে থাকা সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বড় কোনো প্রশাসনিক অভিযোগ না থাকলেও অতীতে ‘বিএনপি সমর্থক’ রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও তিনি সচিব পদে পদোন্নতিতে উপেক্ষিত হওয়ায় প্রশাসনের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে-যদি অতীতের রাজনৈতিক বিবেচনাই এখনো নিয়ামক হয়, তাহলে পরিবর্তনের সুফল কারা পাচ্ছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর প্রশাসনের বঞ্চিত কর্মকর্তারা ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন। তবে এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরেই অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত। কারণ একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ধরনের তথ্য দেওয়া হচ্ছে বা কেন তাকে নেতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তা তিনি জানতেও পারেন না। অতীতে ‘গোয়েন্দা যাচাই’ বা ‘নেতিবাচক বা সরকার বিরোধী প্রতিবেদন’ এর অজুহাতে অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে সচিব পদোন্নতি থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধারণা ছিল, সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনে মেধা, জ্যেষ্ঠতা ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারাই আবারও অগ্রাধিকার পেতে থাকেন। তখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়নে সুবিধা দেওয়া হয়। ঐ নির্দিষ্ট বলয়ের কর্মকর্তারাই লাভজনক বিদেশ পোস্টিং পেয়েছেন। সেই কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন আবার সচিব পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন। ফলে দীর্ঘদিন মাঠ প্রশাসনে কাজ করা বা অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এসব কর্মকর্তা বিগত সময়ে বিভিন্ন সময়ে ডাম্পিং পোস্টিংয়ে ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। বঞ্চিত কর্মকর্তারা মূল্যায়ন পাবেন বলে প্রত্যাশা জাগে। কারণ বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে। তবে নতুন সরকারের তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও সুবিধাভোগীরা আগের মতোই সুবিধা নিয়ে চলছেন। তারা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বরং বঞ্চিত কর্মকর্তারা প্রশাসনে আরও কোনঠাসা হয়ে আছেন। তাদের মধ্যে এখন হতাশা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অভিযোগ প্রশাসনের একটি অলিখিত বলয় সব সময় সক্রিয় থাকে যারা ক্ষমতাসীন শক্তির সঙ্গে দ্রুত সখ্য গড়ে তুলতে পারদর্শী। এর ফলে প্রকৃত মেধাবীরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।

একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমানে প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট’। কারণ, একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতে পারছেন না যে পদোন্নতি প্রক্রিয়া পুরোপুরি নিরপেক্ষ। বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই বিভাজন ও বঞ্চনার সংস্কৃতি দূর করা না গেলে ‘পরিবর্তন’ শব্দটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে। মেধা ও ন্যায্যতার বদলে যদি আবারও ‘সুবিধাভোগী পরিচয়’ যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক কাঠামো। সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হওয়া জরুরি মন্তব্য করে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, বর্তমানে প্রশাসনে এক ধরনের ‘বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট’ তৈরি হয়েছে। কারণ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে করছে পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। তিনি বলেন, যদি মেধার বদলে দলীয় আনুগত্য বা বিশেষ বলয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং কর্মকর্তারা যদি মনে করেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তারা পিছিয়ে পড়ছেন, তবে প্রশাসনের মনোবল ভেঙে যাবে এবং রাষ্ট্রে বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট তৈরি হবে। তার মতে একটি শক্তিশালী সিভিল সার্ভিস ছাড়া রাষ্ট্র কার্যকরভাবে চলতে পারে না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার প্রশাসনে ‘ভারসাম্য’ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবে সেই ভারসাম্য কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী জানিয়েছেন, সরকার পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে যারা অতীতে বঞ্চিত হয়েছেন তাদের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

শেয়ার করতে ক্লিক করুন